• NEWS PORTAL

  • মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬

যুদ্ধ করেও মেলেনি স্বীকৃতি, ৫৫ বছর ধরে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ হওয়ার অপেক্ষায় শাহজাহান চৌধুরী

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি 

প্রকাশিত: ১৬:৫২, ৬ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ১৬:৫৩, ৬ অক্টোবর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
যুদ্ধ করেও মেলেনি স্বীকৃতি, ৫৫ বছর ধরে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ হওয়ার অপেক্ষায় শাহজাহান চৌধুরী

১৯৭১ সালে দেশের স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন। সহযোদ্ধাদের অনেকে পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। যাচাই-বাছাইয়েও হয়েছেন উত্তীর্ণ। এমনকি আদালতের রায়েও তাকে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটে অন্তর্ভুক্তির নির্দেশনা এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও সহযোদ্ধার প্রত্যয়নপত্রেও রয়েছে তার নাম। তবু স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার মো. শাহজাহান চৌধুরীর। 

স্বীকৃতির আশায় বছরের পর বছর দপ্তর থেকে দপ্তরে ঘুরেছেন তিনি। করেছেন মামলা, রিট। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের যাচাই-বাছাইয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও অজ্ঞাত কারণে তার স্বীকৃতি আটকে আছে বলে অভিযোগ শাহজাহানের। দীর্ঘ আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতায় বর্তমানে অনেকটা হতাশাগ্রস্ত হয়ে দিন কাটাচ্ছেন এই মুক্তিযোদ্ধা দাবিদার।

শাহজাহান চৌধুরীর দেওয়া বিভিন্ন নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধকালীন বৃহত্তর ঢাকা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২ নম্বর সেক্টরের ভারপ্রাপ্ত এরিয়া কমান্ডার এবং বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন চৌধুরী ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের একটি তালিকা তৈরি করেন। ওই তালিকাতেও মো. শাহজাহান চৌধুরীর নাম রয়েছে।

এছাড়া মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং বৃহত্তর ঢাকা জেলার দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত আঞ্চলিক অধিনায়ক প্রিন্সিপাল আব্দুর রউফ খান ২০১৪ সালে শাহজাহান চৌধুরীকে তার সহযোদ্ধা হিসেবে প্রত্যয়নপত্র দেন। সেখানে তিনি শাহজাহান চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন বলে উল্লেখ করেন।

শাহজাহান চৌধুরীর দাবি, মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাইয়ের সময় মানিকগঞ্জ থেকে তিনি উত্তীর্ণ হন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) পর্যায়ে তার স্বীকৃতির বিষয়টি আটকে যায়।
এরপর স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য আইনি পথেও হাঁটেন তিনি।

নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১০ সালে মুক্তিযোদ্ধা হাতেম আলী খান দায়ের করা একটি মামলায় অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে মো. শাহজাহান চৌধুরীকেও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আদালতের রায় আসে। তবে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আইনি জটিলতায় সেই প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন হয়নি বলে জানান তিনি।

এরপর ২০১৭ সালে স্থানীয় পর্যায়ে আবারও মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই হয়। সেখানেও শাহজাহান চৌধুরী উত্তীর্ণ হন বলে তার দাবি। বিষয়টি নিয়ে পরে তিনি হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন এবং চলমান আছে। 

নিজের দীর্ঘ আইনি লড়াই নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন শাহজাহান চৌধুরী। এছাড়া তিনি বর্তমানে শ্বাসকষ্ট, হাইপ্রেশার সহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত থাকায় অর্থনৈতিকভাবে খুবই কষ্টে দিন পার করতে হচ্ছে। 

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেও স্বীকৃতি না পাওয়াটা অত্যন্ত দুঃখজনক। দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি। যাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছি, তারা বারবার সাক্ষ্য দিচ্ছেন। যাচাই-বাছাইয়েও উত্তীর্ণ হয়েছি। এরপরও অজ্ঞাত কারণে আমি আমার প্রাপ্য স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, আমি জানতে চাই, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার স্বীকৃতি পেতে কেন আমাকে বারবার আদালতের দ্বারস্থ হতে হবে? স্বাধীনতার এত বছর পরও যদি একজন মুক্তিযোদ্ধাকে তার পরিচয়ের জন্য লড়াই করতে হয়, তাহলে এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে?

শাহজাহান চৌধুরীর সংরক্ষিত নথিপত্রে তার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের পক্ষে একাধিক দলিল রয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধকালীন আঞ্চলিক কমান্ডারের তালিকা, সহযোদ্ধার প্রত্যয়নপত্র এবং বিভিন্ন পর্যায়ের যাচাই-বাছাই-সংক্রান্ত কাগজপত্র রয়েছে।

২০১৪ সালের প্রত্যয়নপত্রে বৃহত্তর ঢাকা জেলা দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত আঞ্চলিক অধিনায়ক  প্রিন্সিপাল আব্দুর রউফ খান তাকে নিজের সহযোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একইভাবে মুক্তিযুদ্ধকালীন বৃহত্তর ঢাকা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৯৭১ সালের ২ নম্বর সেক্টরের ভারপ্রাপ্ত এরিয়া কমান্ডার অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন চৌধুরীর তালিকায় ৬নং সিরিয়ালে তার নাম থাকার দাবি করা হয়েছে।

অন্যদিকে, স্থানীয় পর্যায়ের কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাও শাহজাহান চৌধুরীকে মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে দাবি করছেন।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের ভাষ্য, শাহজাহান চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। যুদ্ধকালীন সময়ে তার ভূমিকা সম্পর্কে স্থানীয় অনেকেই অবগত। দীর্ঘদিন ধরে তাকে এলাকায় ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ শাহজাহান চৌধুরী হিসেবেই অনেকে চেনেন।

তাদের দাবি,যাচাই-বাছাই,সহযোদ্ধার প্রত্যয়ন এবং আদালতের রায়ের বিষয়গুলো যথাযথভাবে পর্যালোচনা করে শাহজাহান চৌধুরীর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন।

তারা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ এবং প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা নিশ্চিত করার স্বার্থে এ ধরনের বিষয় বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত নথিপত্র যাচাই করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা।

বিভি/এসজি

মন্তব্য করুন: