দুই পায়ে হাঁটতে না পারা কামাল জীবিকার তাগিদে ওঠেন গাছের মগডালে!
জন্ম থেকেই দুই পা অচল। অন্য দশজন মানুষের মতো স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেন না। তবু জীবিকার তাগিদে কোমরে দড়ি বেঁধে উঠে পড়েন বড় বড় গাছে। হাতে থাকে দা। প্রায় ৪০ ফুট লম্বা দড়িই তার ভরসা। এভাবেই প্রায় ৩০ বছর ধরে গাছ ছাঁটাই করে সংসার চালাচ্ছেন কামাল হোসেন (৪২)।
শারীরিক প্রতিবন্ধী কামাল হোসেন কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া ইউনিয়নের পং মসূয়া খাঁ বাড়ির আব্দুল হেকিম খাঁর ছেলে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একটি দা, দড়ি আর মোটরচালিত একটি ভ্যানগাড়ি, এই সামান্য সম্বল নিয়েই প্রতিদিন বেরিয়ে পড়েন কামাল। নিজের ভ্যানে করে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে ঘুরে গাছ ছাঁটাইয়ের কাজ খোঁজেন। কাজ মিললেই কোমরে দড়ি বেঁধে উঠে পড়েন বড় গাছে। গাছের ডালপালা ছাঁটাই শেষে একই দড়ির সাহায্যে নেমে আসেন। জন্মগতভাবেই তার দুই পা অচল। তবে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। ছোটবেলা থেকেই দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন তিনি।
কামাল হোসেন জানান, মাত্র ১০ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে গাছের কাজ শুরু করেন। প্রথমে কলাগাছ ও শিমুল গাছের কাজ করতেন। পরে ধীরে ধীরে বড় গাছে ওঠার সাহস ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। একসময় ব্যবসায়ীদের হয়ে গাছ ছাঁটাই করলেও পরে সরাসরি গৃহস্থের বাড়িতে গিয়ে কাজ শুরু করেন।
মানুষের কাছে হাত না পেতে নিজে কাজ করে পরিবার চালানোর ইচ্ছা থেকেই এই পেশাকে বেছে নিয়েছেন বলে জানান কামাল। বিয়ে ও সন্তান হওয়ার পর দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। কিন্তু আয় সে অনুযায়ী বাড়েনি। তবু কাজ ছাড়েননি তিনি।
গাছে ওঠার আগে দড়ির এক মাথায় দা বেঁধে নেন কামাল। এরপর দড়ির অন্য মাথাটি কোমরে বেঁধে ধীরে ধীরে গাছে ওঠেন। ওপরে ওঠার পর দড়ির সাহায্যে দা’টি টেনে উপরে তুলে নেন। এরপর শুরু করেন গাছ ছাঁটাইয়ের কাজ। কাজ শেষে সেই দড়ির সাহায্যেই নেমে আসেন নিচে।
কামাল বলেন, বড় গাছে ওঠা এখন আগের চেয়ে অনেক কঠিন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরেও দুর্বলতা এসেছে। তবু জীবিকার তাগিদে ঝুঁকিপূর্ণ এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। কাজ থাকলে দিনে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। আবার কোনো দিন ৩০০ টাকাতেই কাজ শেষ করতে হয়। গাছ ছাঁটাইয়ের পারিশ্রমিক নির্ধারিত নয়, গৃহস্থের সামর্থ্য ও ইচ্ছার ওপরই অনেকটা নির্ভর করে তার আয়।
কামাল হোসেন বলেন, তার পরিবারে স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে। অন্য সন্তানদের পড়াশোনার খরচ রয়েছে। এর পাশাপাশি অসুস্থ বৃদ্ধ বাবার চিকিৎসা ও দেখাশোনার দায়িত্বও তার ওপর। সংসারের খরচ মেটাতে কখনো ঋণও নিতে হয় তাকে।
কামালের চাচাতো ভাই মো. সোহেল বলেন, দুই পা অচল হলেও কামাল ভাই অনেক বড় বড় গাছে উঠে গাছ ছাঁটাই করেন। অত্যন্ত কষ্ট করে তিনি সংসার চালাচ্ছেন। তার বাবা অসুস্থ এবং পরিবারের দায়িত্বও তার ওপর। সরকারের পক্ষ থেকে যদি তার জন্য একটি স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে পরিবারটি উপকৃত হবে।
তিনি আরও বলেন, কামাল ভাই যেসব গাছে ওঠেন, সেসব গাছে অনেক সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষও উঠতে পারেন না। এটি আল্লাহর বিশেষ রহমত।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল আলী বলেন, ছোটবেলা থেকেই কামাল প্রতিবন্ধী। ৮-১০ বছর বয়স থেকেই তাকে গাছে উঠতে দেখেছেন তারা। অন্যের কাছে হাত না পেতে নিজে কাজ করে আয় করতেই তিনি বেশি আগ্রহী। বড় বড় গাছে তাকে দড়ির সাহায্যে উঠতে দেখে অনেকেই অবাক হন। তার জন্য একটি দোকান বা স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মো. রফিক বলেন, অনেক সুস্থ-সবল মানুষও অন্যের সাহায্য নিয়ে বা ভিক্ষা করে জীবনযাপন করেন। অথচ দুই পা অচল হয়েও কামাল মানুষের কাছে হাত পাতেন না। দড়ির সাহায্যে বড় বড় গাছে উঠে ডালপালা ছাঁটাই করে যে আয় করেন, তা দিয়েই তার সংসার চলে। তার ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।
কামাল বলেন, বয়স এখন ৪২ বছর। আগের মতো আর গাছে উঠতে পারেন না। শরীর দুর্বল হয়ে আসছে, মনোবলও কিছুটা কমেছে। বেশি দিন এই কাজ করা সম্ভব হবে না বুঝতে পারছেন তিনি। তাই সরকারের কাছে তার আবেদন, কোনো একটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হোক।
নিজের একটি ছোট দোকান করার ইচ্ছা রয়েছে কামালের। কিন্তু পুঁজি না থাকায় সেটিও করতে পারছেন না। সরকারের সহযোগিতা পেলে ছোট কোনো ব্যবসা করে পরিবার নিয়ে স্বাবলম্বীভাবে বাঁচতে চান তিনি।
কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা আফরোজ মারলিজ বলেন, কামাল কর্মসংস্থানের জন্য আবেদন করলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার জন্য উপযোগী কোনো ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হবে। তিনি কী ধরনের কাজ করতে পারবেন বা তার কী ধরনের অভিজ্ঞতা রয়েছে, তা জানিয়ে আবেদন করতে হবে। দোকান বা অন্য কোনো কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজন হলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।
বিভি/এসজি













মন্তব্য করুন: