• NEWS PORTAL

  • রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আন্তর্জাতিক প্রসবজনিত ফিস্টুলা নির্মূল দিবস পালিত

অস্ত্রোপচারে প্রতিবছর সেরে উঠছেন পাঁচ শতাধিক ফিস্টুলা রোগী

প্রকাশিত: ১৭:৩৯, ২১ মে ২০২৬

ফন্ট সাইজ
অস্ত্রোপচারে প্রতিবছর সেরে উঠছেন পাঁচ শতাধিক ফিস্টুলা রোগী

দীর্ঘস্থায়ী প্রসব ও প্রসব জটিলতার কারণে নারীরা প্রসবজনিত ফিস্টুলায় ভোগেন। এ রোগে অনবরত প্রস্রাব বা মল নির্গত হওয়ায় ভুক্তভোগী নারীদের শারীরিক জটিলতার পাশাপাশি মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে অত্যন্ত নেতিবাচক অবস্থা মোকাবেলা করতে হয়। অথচ ব্যাপক সচেতনতা ও চিকিৎসার মাধ্যমে প্রসবজনিত ফিস্টুলা প্রতিরোধ ও নিরাময় করা সম্ভব। বর্তমানে দেশে প্রায় ২০,০০০ ফিস্টুলা রোগী আছেন, এছাড়াও প্রতিবছর নতুন করে কয়েক হাজার ফিস্টুলা রোগী তৈরি হচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে প্রসবজনিত ফিস্টুলা নিরাময়ে কাজ করছে।

“নারীর স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করি, প্রসবজনিত ফিস্টুলা নির্মূলে টেকসই বিনিয়োগ জোরদার করি”-এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ২৩ মে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক প্রসবজনিত ফিস্টুলা নির্মূল দিবস ২০২৬ পালন করা হচেছ। 

দিবসটি উদযাপন উপলক্ষ্যে আজ রাজধানীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা বিভাগ বেসকারি সংস্থা সিআইপিআরবি এবং ইউএনএফপিএ বাংলাদেশ এর সহযোগিতায় একটি অ্যাডভোকেসি সভার আয়োজন করেছে।

সভায় বক্তারা বাংলাদেশে ফিস্টুলার বর্তমান পরিস্থিতি, জাতীয় অগ্রগতি, বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাসমূহ, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন। এর পাশাপাশি সভায় টেকসই বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিতকরণ, দক্ষ প্রসবসেবা সম্প্রসারণ এবং সময়মতো জরুরি প্রসূতি সেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

উক্ত সভায় সভাপতি হিসেবে ডা. সৈয়দ কামরুল ইসলাম, ডাইরেক্টর (প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা বিভাগ), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলেন, ফিস্টুলা প্রতিরোধ ও নিরাময় সংক্রান্ত কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ, প্রশিক্ষিত সার্জন, গণমাধ্যম, স্বাস্থ্যসেবা কর্মীসহ সবাইকে রোগী চিহ্নিতকরণ, নিরাময় ও পুর্নবাসনে একযোগে কাজ করতে হবে।

সভায় বিশেষ অতিথি বক্তব‍্যে ওজিএসবি’র প্রেসিডেন্ট ডা. ফিরোজা বেগম কার্যকরভাবে ফিস্টুলা প্রতিরোধে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরির পাশাপাশি হাসপাতালে প্রসববৃদ্ধি ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের ওপর জোর দেন।

জনাব ডা: ভিবাবেন্দ্র রাঘুভানশি, চিফ অফ হেলথ, ইউএনএফপিএ, বিশেষ অথিতি হিসেবে তার বক্তৃতায় বলেন, সরকারিভাবে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত ক্যাম্পেইন আয়োজনের মাধ্যমে ফিস্টুলা কেস চিহ্নিতকরার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অসচেতনতা, প্রত্যন্ত এলাকা, দারিদ্র্য ও সামাজিকভাবে অবহেলার শিকার হওয়ায় ভুক্তভোগী নারীরা প্রায়ই বিষয়টি গোপন করেন বা চিকিৎসা করাতে পারেন না। তাই তাদের চিহ্নিত করার মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় চিকিৎসাসেবা প্রদান ও আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করা সহজ হবে। সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক ডা. আব্দুল হালিম, পরিচালক, প্রজনন ও শিশু স্বাস্থ্য বিভাগ, সিআইপিআরবি।

 সভায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, গণমাধ্যম কর্মী সহ সংশ্লিষ্ট ৫০ জন অংশীজন অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, দেশে ফিস্টুলা চিকিৎসার জন্য মাত্র ৩০ জন দক্ষ সার্জন রয়েছে যারা প্রতিবছর প্রায় ৫০০/৬০০ রোগীকে সফলভাবে অস্ত্রোপাচার বা সার্জারির মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সহায়তা করেন। 

তারা বলেন, বর্তমানে ৩৯ জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে সুনির্দিষ্ট ফিস্টুলা কর্নার আছে। এ রোগ নিরাময়ে সারাদেশের হাসপাতালগুলোতে এ সেবা চালু করতে হবে। এছাড়াও দেশে দক্ষ সার্জন তৈরি করতে এ বিষয়ে কমপক্ষে ৩ মাসের প্রশিক্ষণ, রোগ চিহ্নিত করা, অস্ত্রোপচার, আর্থিক সহায়তা, পুষ্টি নিশ্চিতকরণ, ও তাদের সামাজিক মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে সবাইকে সমন্বিতভাব কাজ করতে হবে।

উল্লেখ্য, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও UNFPA-এর তথ্যমতে, বিশ্বে প্রতিবছর আনুমানিক ৫০ হাজার থেকে এক লাখ নতুন প্রসবজনিত ফিস্টুলার ঘটনা ঘটছে যার অধিকাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশসমূহে। এই সমস্যা বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে বেশি। বাংলাদেশে গত দুই দশকে প্রসবজনিত ফিস্টুলার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও এখনও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিদ্যমান। ইউএনএফপিএ -এর ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে প্রতি ১ লাখ নারীর মধ্যে প্রায় ৪২ জন ফিস্টুলায় আক্রান্ত ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাতৃস্বাস্থ্য কর্মসূচির আওতায় ২০১৯ সাল থেকে ইউএনএফপিএ এবং সিআইপিআরবি প্রসবজনিত ফিস্টুলা প্রতিরোধে কাজ করছে। যার আওতায় রোগী শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। মাতৃস্বাস্থ্য কর্মসূচির আওতায় বর্তমানে দেশের ৩৯টি জেলা হাসপাতালে ফিস্টুলা কর্নার চালু রয়েছে, যেখানে রোগী শনাক্তকরণ ও রেফারেল কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি ২৩টি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩০ জন প্রশিক্ষিত ফিস্টুলা সার্জন নিয়মিত অস্ত্রোপচার সেবা প্রদান করছেন। যার অংশ হিসেবে প্রতিবছর গড়ে ৫০০-৬০০ জন রোগীর সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হচ্ছে।

বিভি/এমআর

মন্তব্য করুন: