• NEWS PORTAL

  • রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আলজাজিরা এক্সপ্লেইনার

জাপানে ১ লাখের বেশি শতবর্ষী: যেভাবে বুড়িয়ে যাচ্ছে সমাজ

প্রকাশিত: ২২:২৩, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
জাপানে ১ লাখের বেশি শতবর্ষী: যেভাবে বুড়িয়ে যাচ্ছে সমাজ

ছবি: আলজাজিরা (গেটি ইমেজ)

জাপানে ১০০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রথমবারের মতো ১ লাখ ছাড়িয়েছে। দেশটিতে এখন শতবর্ষী মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৭ হাজার ৬৭৭ জন। দীর্ঘায়ুর এই মাইলফলক যেমন দেশটির স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাব্যবস্থার অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরছে, তেমনি বিপরীত দিকে জন্মহার রেকর্ড সর্বনিম্নে নেমে যাওয়ায় দ্রুত বয়স্ক হয়ে পড়ছে জাপানের জনসংখ্যা। ফলে একদিকে বাড়ছে দীর্ঘজীবী মানুষের সংখ্যা, অন্যদিকে সংকুচিত হচ্ছে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী—যা দেশটির অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

জাপানের স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর দেশটিতে শতবর্ষী মানুষের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় ৭ হাজার ৯১৪ জন বেড়েছে। এ নিয়ে টানা ৫৬ বছর জাপানে শতবর্ষী মানুষের সংখ্যা বাড়ল। মোট শতবর্ষীর প্রায় ৮৮ শতাংশই নারী।

জাপানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী কেনইচিরো উয়েনো বলেছেন, অনেক মানুষ দীর্ঘ, সুস্থ ও সক্রিয় জীবনযাপন করছেন—এটি অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। চিকিৎসা প্রযুক্তির অগ্রগতি, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসকে দীর্ঘায়ুর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

তবে দীর্ঘায়ুর এই সাফল্যের আড়ালে রয়েছে বড় ধরনের জনমিতিক ভারসাম্যহীনতা। একদিকে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে জন্মহার ক্রমাগত কমছে। ফলে পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা ও বয়স্কদের সামাজিক সেবার বাড়তি ব্যয় সামলাতে ক্রমেই ছোট হয়ে আসা কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ বাড়ছে।

জাপান বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক জনসংখ্যার দেশগুলোর একটি। দেশটির প্রতি ১০ জন বাসিন্দার মধ্যে প্রায় তিনজনের বয়স ৬৫ বছর বা তার বেশি। ২০৭০ সালের মধ্যে এই হার প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর জাপানে ৯৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ৮ লাখ ছাড়িয়েছে। বিপরীতে, একই সময়ে জন্ম নিয়েছে মাত্র ৭ লাখ শিশু।

ফলে দেশটির মোট জনসংখ্যাও দ্রুত কমছে। প্রাথমিক আদমশুমারির তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে জাপানের ৪৭টি প্রশাসনিক অঞ্চলের মধ্যে ৪৫টির জনসংখ্যা পাঁচ বছর আগের তুলনায় কমেছে। শুধু টোকিও ও ওকিনাওয়ায় জনসংখ্যা বেড়েছে।

জাপানের জনসংখ্যা ২০০৮ সালে প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। জাতীয় জনসংখ্যা ও সামাজিক নিরাপত্তা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৭০ সালের মধ্যে তা কমে প্রায় ৮ কোটি ৭০ লাখে নেমে যেতে পারে। অর্থাৎ, প্রায় ৩০ শতাংশ জনসংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জাপানে মানুষের দীর্ঘায়ুর পেছনে একক কোনো কারণ নেই। গবেষকেরা খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবার সমন্বিত প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন। জাপানের ঐতিহ্যবাহী খাবারে মাছ, শাকসবজি ও ভাতের পরিমাণ বেশি এবং তুলনামূলকভাবে স্যাচুরেটেড ফ্যাট কম। অনেক পশ্চিমা দেশের তুলনায় দেশটিতে স্থূলতার হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

জীবনযাত্রার ধরনও এতে ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক জাপানি নিয়মিত হাঁটেন, সাইকেল চালান এবং গণপরিবহন ব্যবহার করেন। বয়স্কদের মধ্যেও এসব অভ্যাস দেখা যায়। পাশাপাশি দলগত ব্যায়ামও দেশটিতে ব্যাপকভাবে প্রচলিত।

জাপানের সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থার কারণে দেশটির মানুষের চিকিৎসা ও ওষুধের সুবিধাও তুলনামূলক কম খরচে পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো কিছু দেশের তুলনায় চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দীর্ঘায়ু কেন সমস্যায় ফেলছে জাপানকে?

দীর্ঘ জীবন নিঃসন্দেহে একটি অর্জন। কিন্তু জাপানে এই দীর্ঘায়ু ঘটছে বিশ্বের অন্যতম নিম্ন জন্মহারের সঙ্গে। ২০২৫ সালে দেশটির মোট প্রজনন হার রেকর্ড সর্বনিম্ন ১ দশমিক ১৪-তে নেমেছে। জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে সাধারণত ২ দশমিক ১ প্রজনন হার প্রয়োজন বলে মনে করা হয়, যদি কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী বাড়াতে অভিবাসনের ওপর নির্ভর করা না হয়।

জনসংখ্যা বয়স্ক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পেনশনভোগীর সংখ্যা বাড়ে। তাদের স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সেবার প্রয়োজনও তুলনামূলক বেশি হতে পারে। কিন্তু একই সময়ে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমতে থাকায় অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ে।

জন্মহার বাড়াতে জাপান সরকার শিশু ভাতা, ভর্তুকি দেওয়া শিশু পরিচর্যা, অভিভাবকদের ছুটি এবং বিভিন্ন প্রণোদনা চালু করেছে। তবে এসব উদ্যোগ এখনো দীর্ঘমেয়াদি জন্মহার কমার প্রবণতা উল্টাতে পারেনি।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, জাপানে বিয়ের হারও কমছে অথবা মানুষ দেরিতে বিয়ে করছেন। এতে সন্তান নেওয়ার সুযোগও কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, স্থবির মজুরি ও দীর্ঘ কর্মঘণ্টা তরুণদের জন্য পরিবার গঠনকে কঠিন করে তুলছে।

কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও শিশু লালন-পালন ও গৃহস্থালির দায়িত্ব সমানভাবে ভাগ না হওয়ায় নারীদের জন্য ক্যারিয়ার ও পরিবার সামলানোও কঠিন হয়ে উঠছে।

প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি জনসংখ্যা হ্রাস ও জন্মহার কমে যাওয়াকে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। জাপানের কর্মকর্তারাও বারবার সতর্ক করে বলেছেন, এই প্রবণতা দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়ছে?

কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী কমে যাওয়ার অর্থ হলো আয়কর ও সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় অবদান রাখার মানুষের সংখ্যাও কমছে। বিপরীতে পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা ও বয়স্কদের পরিচর্যার ব্যয় বাড়ছে।

এর ফলে সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে করের মাধ্যমে পুরো ব্যবস্থাকে সহায়তা করা তরুণ কর্মীদের ওপরও বাড়ছে বোঝা।

কর্মী সংকটের প্রভাব পড়ছে নির্মাণ, কৃষি, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা ও বয়স্কদের পরিচর্যার মতো বিভিন্ন খাতে। গ্রামীণ এলাকাগুলোতে সমস্যা আরও তীব্র। তরুণেরা শহরে চলে যাওয়ায় অনেক গ্রামে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমছে এবং জনসেবাও সংকুচিত হচ্ছে।

শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় অভিবাসন একটি সম্ভাব্য পথ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাপানে বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা বেড়েছে। তবে দেশটির মোট জনসংখ্যার মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ বিদেশি নাগরিক। আরও বেশি অভিবাসী গ্রহণের প্রস্তাবও জাপানে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত।

অন্য দেশগুলোও কি বয়স্ক হয়ে পড়ছে?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, মানুষের গড় আয়ু বাড়া মানবজাতির অন্যতম বড় অর্জন। সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যসেবার অগ্রগতির ফলে বিশেhttps://www.aljazeera.com/news/2026/9/19/japan-has-record-100000-people-aged-over-100-how-societies-are-ageingষ করে বয়স্ক মানুষের মৃত্যুহার কমেছে। ফলে বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ এখন ৬০ বছর বা তারও বেশি বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকার আশা করতে পারেন।

ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে গড় আয়ু ছিল ৭৩ দশমিক ৩ বছর, যা ১৯৯৫ সালের তুলনায় ৮ দশমিক ৪ বছর বেশি। ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ২০২৩ সালের ১১০ কোটি থেকে বেড়ে ২০৩০ সালে ১৪০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে।

তবে সব দেশে এই পরিবর্তনের গতি এক নয়। জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন প্রসপেক্টস’-এর সর্বশেষ ঐতিহাসিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে জাপানের মধ্যম বয়স ছিল ৪৯ বছর। এরপর ইতালিতে ৪৭ দশমিক ৫, পর্তুগালে ৪৬ দশমিক ২, গ্রিসে ৪৫ দশমিক ৭ এবং জার্মানিতে ৪৫ দশমিক ১ বছর।

অর্থাৎ, মানুষের দীর্ঘায়ু যেমন স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য, তেমনি জন্মহার কমে গেলে তা জনসংখ্যার কাঠামো ও অর্থনীতিতে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জও তৈরি করতে পারে।

সূত্র: আলজাজিরা

বিভি/পিএইচ

মন্তব্য করুন: