• NEWS PORTAL

  • শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬

এআই যুগে ভারতকে আরও শক্তিশালী করতে চান নরেন্দ্র মোদি, তবে...

প্রকাশিত: ১৪:০৮, ৯ অক্টোবর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
এআই যুগে ভারতকে আরও শক্তিশালী করতে চান নরেন্দ্র মোদি, তবে...

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের যুগে ভারতকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে চান দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এ লক্ষ্য সামনে রেখে দেশজুড়ে গড়ে উঠছে বিপুলসংখ্যক ডেটা সেন্টার। তবে এসব স্থাপনা নির্মাণকে ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ। তাদের অভিযোগ, ডেটা সেন্টারের কারণে শব্দদূষণ, বিদ্যুৎ ও পানির ওপর বাড়তি চাপ এবং আবাসিক এলাকায় শিল্পায়নের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

ভারতের প্রকৌশলী তুষার শেঠির মুম্বাইয়ের অ্যাপার্টমেন্টের ২১ তলার জানালা দিয়ে তাকালে এই বিরোধের চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একসময় তার বাড়ির সামনে ছিল সবুজে ঘেরা এলাকা। এখন সেখানে গাছ কেটে তৈরি করা হয়েছে লাল মাটির বিস্তীর্ণ জায়গা। ওই স্থানেই অ্যামাজনের একটি ডেটা সেন্টার নির্মাণের কাজ চলছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতে এআই অবকাঠামো গড়ে তুলতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পিত ২১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের অংশ এই প্রকল্প। ৪৬ বছর বয়সী তুষার শেঠি বলেন, ‘আমি যদি আগে জানতাম, তাহলে এই বাড়িটি কিনতাম না।’ মাত্র পাঁচ মাস আগে বাড়িটি কিনেছিলেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া থেকে নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম ও আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনের উপকণ্ঠ- বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরুদ্ধে স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিবাদ বাড়ছে। তাদের অভিযোগ, এসব স্থাপনা থেকে শব্দদূষণ হচ্ছে, বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে, পানির সংকট তীব্র হচ্ছে এবং আবাসিক এলাকাগুলো ক্রমেই শিল্পাঞ্চলে পরিণত হচ্ছে।

ভারতেও এই প্রতিরোধ জোরালো হচ্ছে। অ্যামাজন, গুগল ও মাইক্রোসফট দেশটিতে ডেটা সেন্টার নির্মাণে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। এর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে, যেখানে ভারতকে ‘সারা বিশ্বের ডেটার কেন্দ্র’ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পশ্চিমের মহারাষ্ট্র থেকে দক্ষিণের অন্ধ্রপ্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে এই অবকাঠামো।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো উন্নত এআই মডেল তৈরিতে আপাতত পিছিয়ে থাকলেও ভারত ভিন্ন পথে এগোচ্ছে। দেশটির ধারণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারলেও তা বড় অর্থনৈতিক সুবিধা এনে দিতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাক-অফিস হিসেবে ভারতের যে পরিচিতি, তার গুরুত্ব কমতে থাকায় নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে এআই অবকাঠামোকে সামনে আনছে মোদি সরকার। তবে এই উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংঘাত তৈরি হচ্ছে সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ এবং ডেটা সেন্টারের আশপাশে বসবাসকারী মানুষের স্বার্থের।

ভারতে বিশ্বের মোট মিঠাপানির মাত্র ৪ শতাংশ রয়েছে, অথচ বিশ্বের জনসংখ্যার ১৮ শতাংশের বাস দেশটিতে। এরই মধ্যে পানিসংকটে থাকা বিভিন্ন শহরে গড়ে উঠছে ডেটা সেন্টার। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের হিসাবে, চলতি দশকের মধ্যেই ভারতের ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ ডেটা সেন্টার তীব্র পানিসংকটের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান মর্ডর ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ডেটা সেন্টারগুলো প্রায় ১৫০ বিলিয়ন লিটার পানি ব্যবহার করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে।

মুম্বাইয়ের কাছে অ্যামাজনের ডেটা সেন্টার প্রকল্পটি ভারতে এ নিয়ে চলমান বিতর্কের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। রয়টার্সের দুই ডজনের বেশি বাসিন্দার সাক্ষাৎকার এবং সরকারি চিঠিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তাদের আশঙ্কা, প্রকল্পটি এলাকার বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহে চাপ সৃষ্টি করবে। পাশাপাশি এর শব্দ শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

তবে অ্যামাজন ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ প্রকল্পটির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের দাবি, পানি ও বিদ্যুতের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকায় এটি স্থানীয় জনগণের জন্য সরবরাহ করা পরিষেবার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে না। তা সত্ত্বেও প্রকল্পটি ঘিরে রাস্তায় নেমেছেন বাসিন্দারা। বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারাও তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন।

মোদি সরকারও প্রকাশ্যে প্রকল্পগুলোর পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে অনলাইনে ডেটা সেন্টারকে ভারতের ‘ডিজিটাল জীবনের পেছনে শক্তি জোগানো অদৃশ্য ইঞ্জিন’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। একই সঙ্গে বলা হচ্ছে, আধুনিক প্রযুক্তিতে পানি ও বিদ্যুতের ব্যবহার আরও দক্ষতার সঙ্গে করা সম্ভব। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে ভারতের ইলেকট্রনিকস ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয়ে যোগাযোগ করলেও তারা সাড়া দেয়নি।

গত ৮ সেপ্টেম্বর প্রকল্প এলাকার পাশে শত শত বাসিন্দা জড়ো হন। তাদের মধ্যে বয়স্ক মানুষও ছিলেন। তাদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘ডেটা সেন্টার বিদ্যুৎখেকো দানব।’ তারা প্রকল্পটি অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানান। ৬২ বছর বয়সী বাসিন্দা বাসুধা শেঠি ওই পরিকল্পিত ৫৪ একর আয়তনের স্থাপনার কাছে একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। তবে অবসরের দিনগুলো শান্তিতে কাটানোর স্বার্থে তিনি প্রকল্পটির বিরোধিতা করছেন।

বাসুধা বলেন, ‘ডেটা সেন্টারের কাজ বন্ধ হলে আমরা এখানেই থাকব। আর প্রকল্পটি এগিয়ে গেলে আমরা চলে যাব।’ প্রকল্প এলাকার আশপাশে বসবাসকারী এক হাজারের বেশি মানুষের অভিযোগ, তাদের সঙ্গে অর্থবহ কোনো আলোচনা ছাড়াই প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ডেটা সেন্টার থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় ২০২৪ সালে একই ধরনের তিনটি স্থাপনা নির্মাণের একটি প্রস্তাব স্থগিত করেছিল অ্যামাজন। শব্দদূষণ ও আবাসিক এলাকার কাছাকাছি অবস্থান নিয়ে উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য আরও সময় নেওয়ার কথা জানিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। তবে মুম্বাইয়ের বাসিন্দারা বলছেন, তাদের সেই সুযোগই দেওয়া হয়নি।

প্রকল্প পরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, ভারতের সরকারি কর্মকর্তারা বিক্ষোভ একসময় থেমে যাবে বলে ইঙ্গিত দেওয়ায় অ্যামাজন আপাতত বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি উদ্বিগ্ন নয়। তবে শব্দদূষণ, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগ দূর করতে বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগের পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।

ওই সূত্র বলেন, ‘ডেটা সেন্টার নির্মাণের কিছু মূল্য দিতে হয়। বিশ্বজুড়ে অ্যামাজন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করতে এবং তাদের ভোগান্তি সীমিত রাখতে প্রস্তুত। আপাতত বিক্ষোভের মধ্যেই চলা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।’

অ্যামাজন রয়টার্সকে জানিয়েছে, তাদের ডেটা সেন্টারে শীতলীকরণের জন্য পানি ব্যবহার করা হবে না। আবাসিক এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ থেকে আলাদা একটি নির্দিষ্ট বিদ্যুৎব্যবস্থা থাকবে এবং শব্দদূষণ কমাতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতিষ্ঠানটির আরও দাবি, যত গাছ কাটা হয়েছে, তার চেয়ে বেশি নতুন গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। তবে প্রযুক্তি খাতের কিছু উদ্যোক্তাও মনে করেন, আবাসিক এলাকার পাশে ডেটা সেন্টার নির্মাণ করা উচিত নয়।

১৪টি ডেটা সেন্টার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান সাইফি ইনফিনিট স্পেসেসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শরদ আগরওয়াল সেপ্টেম্বরে এক শিল্পবিষয়ক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমি কখনো আবাসিক এলাকায় ডেটা সেন্টার নির্মাণ করব না।’ তার ভাষ্য, ডেটা সেন্টার পরিচালনায় প্রচুর পরিমাণে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও পানির প্রয়োজন হয়। কোনো সংকট দেখা দিলে আবাসিক এলাকার পাশে থাকা এসব স্থাপনা প্রয়োজনীয় সম্পদের অভাবে পড়তে পারে।

এদিকে মাইক্রোসফটও ভারতে চার বছরে ২০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এর বেশির ভাগ অর্থ ব্যয় করা হবে এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণে।

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য অন্ধ্রপ্রদেশে গুগলের ১৫ বিলিয়ন ডলারের ডেটা সেন্টার প্রকল্পের বিরোধিতা করছেন পরিবেশবাদীরা। তাদের আশঙ্কা, প্রকল্পটি বন্য প্রাণী, পানির উৎস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া অনুমতি ছাড়াই একটি মন্দিরের জমি ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন তারা। তবে গুগল ও রাজ্য সরকার কোনো অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ডেটা সেন্টারবিরোধী আন্দোলন রাজনৈতিক রূপও নিয়েছে। সেপ্টেম্বরে মুম্বাইয়ের বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যোগ দেন বিরোধী দলের আইনপ্রণেতা আদিত্য ঠাকরে। তিনি অ্যামাজনের প্রকল্পটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানান। তার বক্তব্য, তার দল আবার ক্ষমতায় ফিরলে প্রকল্পটি সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেবে।

মুম্বাইয়ের আবাসন ব্যবসায়ী অতুল যাদব বলেন, ডেটা সেন্টারের কারণে আশপাশের এলাকার দৃশ্যপট ও সম্পত্তির মূল্য নিয়ে ক্রেতাদের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে ওই এলাকার ফ্ল্যাটের পুনর্বিক্রয়মূল্যেও। এলাকাটিতে ৩০ বছর ধরে বসবাস করছেন ৬৮ বছর বয়সী বিদ্যা কদম। প্রকল্পটির বিরোধিতা করে তিনি বলেন, ‘এটি বন্ধ করতে আমরা রাস্তায় নামব এবং যা যা করা প্রয়োজন, সবই করব।’

সূত্র: রয়টার্স

বিভি/পিএইচ

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত