• NEWS PORTAL

  • শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স, রাজপথে হাজারো মানুষ

প্রকাশিত: ২২:৫৪, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ২২:৫৬, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স, রাজপথে হাজারো মানুষ

ফ্রান্সজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নানা সমস্যা নিয়ে বিক্ষোভে নেমেছেন হাজারো মানুষ। শনিবার (১৭ অক্টোবর) দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করেছে। বিক্ষোভ থেকে কয়েক ডজন মানুষকে আটক করেছে কর্তৃপক্ষ।

শিক্ষকসংকট, জরাজীর্ণ বিদ্যালয় ভবন এবং পুলিশের সহিংসতার অভিযোগ থেকে শুরু হওয়া এ আন্দোলনে পরে যোগ দেন উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জনসেবা খাতের অবনতিতে ক্ষুব্ধ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

মার্সেই শহরে বিক্ষোভকারীরা সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়া নিরাপত্তাবেষ্টনী দিয়ে ধাক্কা দিয়ে সিটি হলের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। তাঁদের একজন দেয়ালে নৈরাজ্যবাদের প্রতীক ‘এ’ আঁকেন। পরে পুলিশ তাঁদের সরিয়ে দেয়।

রাজধানী প্যারিসের প্লাস দে লা রিপাবলিক এলাকায় শান্তিপূর্ণ মিছিল একপর্যায়ে সহিংস রূপ নেয়। কালো পোশাক ও মুখোশ পরা কিছু বিক্ষোভকারী আতশবাজি ও পাথর নিক্ষেপ করেন। তারা একটি ব্যাংকে হামলা চালান এবং একটি ক্রীড়াসামগ্রীর দোকানে লুটপাট করেন। এ সময় পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছোড়ে।

বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ ময়লার পাত্রে আগুন ধরিয়ে দেন। একটি ট্রাকেও আগুন দেওয়া হয়, যা পরে পাশের একটি ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। টিয়ার গ্যাসের ঘন ধোঁয়া আশপাশের ভবনের ছাদ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। পরিস্থিতির কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের জানালা ও দরজা বন্ধ রাখতে হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া আহ্বানের পর শনিবারের বিক্ষোভে অংশ নেন হাজারো মানুষ। ২০১৮ সালে সামাজিক অবিচারের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন পুনরুজ্জীবিত করার ডাকও দেওয়া হয়।

গত মাসে প্যারিসের দরিদ্র উত্তরাঞ্চলীয় উপশহরগুলোর কয়েকটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের অনুপস্থিতি ও অবকাঠামোগত দুরবস্থার প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু হয়। পরে তা বৈষম্য, সরকারি ব্যয় সংকোচন এবং জনসেবার মান কমে যাওয়ার বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলনে রূপ নেয়।

এবারের বিক্ষোভে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, শ্রমিক, পেনশনভোগী ও কৃষকদেরও যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। ফ্রান্সের অন্যতম বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন সিজিটি আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে মজুরি ও পেনশন বাড়ানো, দ্রব্যমূল্য কমানো এবং জনসেবা খাতের সুরক্ষার দাবি জানিয়েছে।

ফরাসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শনিবার দুপুর পর্যন্ত প্যারিসের বাইরে ১৪০টি বিক্ষোভ কর্মসূচিতে ৩২ হাজার ৮০০ মানুষের অংশগ্রহণের তথ্য পাওয়া গেছে। কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, চরম বামপন্থি গোষ্ঠীগুলো অস্থিরতা ও সহিংসতায় ইন্ধন দিচ্ছে।

প্যারিসের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। নিরাপত্তার কারণে শঁজেলিজে অ্যাভিনিউ ও আর্ক দ্য ত্রিয়ঁফের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানের আশপাশে বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়নি। পুলিশের অনুরোধে শঁজেলিজে, প্রেসিডেন্টের বাসভবন, পার্লামেন্ট ও সরকারি কার্যালয়ের আশপাশের বেশ কয়েকটি মেট্রো স্টেশনও বন্ধ রাখা হয়।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছিলেন, দেশজুড়ে শত শত বিক্ষোভ কর্মসূচি এবং ৮০টির বেশি মিছিল হতে পারে। এর মধ্যে আকস্মিক জমায়েত, সড়ক অবরোধ ও মিছিলও রয়েছে।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ১৯ বছর বয়সী এক তরুণী লোলা বলেন, জ্বালানির দামসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য মানুষের জীবন কঠিন করে তুলেছে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষক ও উন্নত শিক্ষার পরিবেশের দাবিতে বিক্ষোভ করতে গিয়ে সহিংসতার শিকার হচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর ক্ষমতার মেয়াদের শেষ পর্যায়ে ফ্রান্সের রাজনৈতিক অঙ্গন আরও বিভক্ত হয়ে পড়েছে। শুক্রবার তিনি বিক্ষোভকারীদের শান্ত থাকার এবং মানুষ ও সম্পদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান জানান।

মাখোঁ বলেন, বিক্ষোভ ও মতপ্রকাশের অধিকার সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। তবে সেই অধিকারের সঙ্গে মানুষ ও সম্পদের প্রতি সম্মান দেখানোর দায়িত্বও রয়েছে। শুধু ভাঙচুর ও অস্থিরতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে যারা বিক্ষোভে অংশ নেয়, তাদের কর্মকাণ্ডকে তিনি অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেন।

দেশটির বাম ও ডানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোও আন্দোলনকে ঘিরে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে। চরম বামপন্থি দল ফ্রান্স আনবোওয়েডের নেতা জঁ-লুক মেলঁশ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। অন্যদিকে ডানপন্থি দলগুলো পুলিশের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে।

এর আগে কয়েক সপ্তাহের বিক্ষোভে হাজারো মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, আহত হয়েছেন শত শত মানুষ এবং কয়েকটি বিদ্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের সহিংসতার অভিযোগ তদন্ত করছে দেশটির পুলিশ তদারকি সংস্থা। ফরাসি প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, এ সময়ে ৯০০-এর বেশি পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন।

বিক্ষোভ দমনে পুলিশের ব্যবহৃত অস্ত্র নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এক কিশোরের হাত বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ তরুণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে এক ধরনের স্টান গ্রেনেডের ব্যবহার স্থগিত করেছিলেন। তবে শনিবারের বিক্ষোভে সেটি ব্যবহারের সুযোগ থাকবে বলে জানান তিনি। মঙ্গলবার জলবায়ু ও সামাজিক ন্যায়বিচারকর্মী গ্রেটা থুনবার্গও প্যারিসের উপশহর সাঁ-দেনির একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেন।

সূত্র: গার্ডিয়ান

বিভি/পিএইচ

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত