মঙ্গল গ্রহের মাটিতে রহস্যময় গর্ত, যা বলছে বিজ্ঞানীরা
ফাইল ছবি
মঙ্গল গ্রহে ছোট ছোট অদ্ভুত গর্তের একটি বিন্যাসের সন্ধান পেয়েছে নাসার কিউরিওসিটি রোভার। প্রথম দেখায় গর্তগুলোকে অনেকটা পায়ের ছাপের মতো মনে হলেও বিজ্ঞানীরা বলছেন, এগুলো কোনো প্রাণী বা বস্তুর মঙ্গলের পৃষ্ঠে চলাচলের চিহ্ন নয়। বরং এর পেছনে ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া কাজ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মঙ্গলের মাউন্ট শার্প এলাকায় অনুসন্ধান চালানোর সময় এসব অস্বাভাবিক গঠন ক্যামেরাবন্দি করে কিউরিওসিটি। নতুন আবিষ্কৃত গর্তগুলোর প্রতিটির ব্যাস আনুমানিক ১ সেন্টিমিটার। উন্মুক্ত শিলাস্তরের ওপর এগুলো অগভীর খাঁজ বা অবনতির মতো দেখা যাচ্ছে।
মঙ্গলের পৃষ্ঠে ছোট গর্ত ও ক্ষয়চিহ্ন নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে এবারের গঠনগুলো বিজ্ঞানীদের বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। কারণ গর্তগুলোর আকৃতি কিছুটা অস্বাভাবিক এবং এগুলো তৈরির পেছনে দায়ী হতে পারে—এমন কোনো দৃশ্যমান বস্তু আশপাশে পাওয়া যায়নি।
নাসার মার্স হ্যান্ড লেন্স ইমেজার (এমএএইচএলআই) কর্মসূচির উপপ্রধান তদন্তকারী মিশেল মিনিত্তি বলেন, কিউরিওসিটি এর আগে মঙ্গলে যেসব ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য দেখেছে, নতুন গঠনগুলো সেগুলোর সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
মিনিত্তির ভাষ্য, মঙ্গলে দীর্ঘ সময় অনুসন্ধান চালানোর পরও কিউরিওসিটি নতুন নতুন বৈশিষ্ট্যের সন্ধান দিয়ে চলেছে। সম্প্রতি রোভারের অনুসন্ধানের দুটি এলাকাতেই এমন কিছু গঠন দেখা গেছে, যা আগে প্রায় দেখা যায়নি। এগুলো ছিল শিলাস্তরের ওপর ছড়িয়ে থাকা প্রশস্ত ও অগভীর গর্ত।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, মঙ্গলে এ ধরনের গর্ত তৈরির একটি সম্ভাব্য কারণ হলো শিলার ক্ষয়। কোনো শক্ত নডিউল বা ছোট পাথর আশপাশের অপেক্ষাকৃত নরম শিলা থেকে ক্ষয় হয়ে বেরিয়ে গেলে সেখানে শূন্যস্থান তৈরি হতে পারে। পরবর্তী সময়ে সেটি গর্তের মতো দেখাতে পারে।
তবে এবারের গর্তগুলো আগের পরিচিত বৈশিষ্ট্যের তুলনায় তুলনামূলকভাবে বেশি প্রশস্ত ও অগভীর। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গর্তগুলোর সঙ্গে এমন কোনো বস্তু পাওয়া যায়নি, যা থেকে বোঝা যায় সেটি আগে সেখানে অবস্থান করছিল।
তাই এসব গঠনকে কোনো প্রাণী বা অন্য কোনো বস্তুর পদচিহ্ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গবেষকদের ধারণা, এর পেছনে মঙ্গলের ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়াই দায়ী। তবে ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় গর্তগুলো তৈরি হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
মিনিত্তি বলেন, মাউন্ট শার্পের এই অংশের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে নতুন গর্তগুলো একটি নতুন ধাঁধা তৈরি করেছে। শিলাস্তরের নির্দিষ্ট অংশে কী ধরনের প্রক্রিয়া কাজ করেছে, তা বোঝার ক্ষেত্রে এই বৈশিষ্ট্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।
গর্তগুলোর আশপাশের শিলাস্তরও পরীক্ষা করেছে কিউরিওসিটি। সেখানে বিভিন্ন ধরনের গঠন ও স্তর শনাক্ত হয়েছে। রোভারের যন্ত্রগুলো আশপাশের শিলাস্তরের তুলনায় অপেক্ষাকৃত শক্ত কিছু স্তরের অস্তিত্বও শনাক্ত করেছে। গবেষকদের ধারণা, শিলার রাসায়নিক গঠনের পার্থক্যের কারণে এসব শক্ত স্তর তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
২০১২ সালে মঙ্গলে অবতরণের পর থেকে কিউরিওসিটি রোভার গ্রহটির বিভিন্ন অস্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা করে আসছে। নতুন এই আবিষ্কার সেই দীর্ঘ অনুসন্ধানের তালিকায় আরও একটি সংযোজন।
এখন পর্যন্ত কিউরিওসিটি মঙ্গলে ৫ হাজারেরও বেশি দিন কাটিয়েছে এবং গ্রহটির পৃষ্ঠের অসংখ্য ছবি পৃথিবীতে পাঠিয়েছে। এ পর্যন্ত রোভারটি ৭ লাখেরও বেশি ছবি পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে।
কিউরিওসিটির সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণগুলো মাউন্ট শার্পের শিলা এবং মঙ্গলের পৃষ্ঠ কীভাবে গঠিত হয়েছে ও সময়ের সঙ্গে কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তা বুঝতে বিজ্ঞানীদের সহায়তা করছে।
প্রথম দেখায় গর্তগুলোকে পায়ের ছাপের মতো মনে হলেও, সেখানে কোনো প্রাণী বা বস্তু চলাচলের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে বিজ্ঞানীদের কাছে আবিষ্কারটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ক্ষুদ্র এই গর্তগুলো মঙ্গলের পৃষ্ঠকে আকৃতি দেওয়া ভূতাত্ত্বিক শক্তি ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে নতুন সূত্র দিতে পারে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
বিভি/টিটি













মন্তব্য করুন: