• NEWS PORTAL

  • বুধবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৪

পরিবার পরিকল্পনা যেকারণে বন্ধ

মনজুরুল হক

প্রকাশিত: ১৬:২৫, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

আপডেট: ১৬:২৯, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

ফন্ট সাইজ
পরিবার পরিকল্পনা যেকারণে বন্ধ

একাত্তরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার মধ্যে অন্যতম ছিলো পরিবার পরিকল্পনা বা ফ্যামিলি প্ল্যানিং। স্লোগান ছিলো-'ছেলে হোক মেয়ে হোক একটি সন্তানই যথেষ্ট। সে সময়কার সামাজিক অবস্থায় ফ্যামিলি প্ল্যানিং বাস্তবায়ন কষ্টসাধ্য ছিলো। মোল্লাদের বাধা ছিলো। তার পরও প্রকল্প বন্ধ হয়নি। যদিও সাড়ে সাত কোটি থেকে হু হু করে বাড়ছিলই। প্ররিকল্পনা গ্রহণকারীদের সে সময় বিনামূল্যে শাড়ি-লুঙ্গি উপহার দেয়া হতো। নব্বইয়ের দশকে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালিন ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের প্রচার কমতে থাকে। ২০০৮ থেকে আওয়ামী লীগ  টানা পনের বছর ক্ষমতায় আছে। এই সময়ে পরিবার পরিকল্পনা অফিস, স্টাফ, কর্মকাণ্ড, ভ্যাসেক্টমি-লাইগেশন মুখ থুবড়ে পড়েছে।



পড়েনি বলা ভুল হবে, নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এখন সম্ভবত পুরোপুরি বন্ধ। কারণ কি? মানুষ আর পরিবার ছোট রাখতে রাজি হচ্ছে না? মোল্লারা বিরোধীতা করছে? না, এসবের কিছুই নয়। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বুদ্ধি দিয়েছে-'যতো মানুষ ততো শ্রমিক, যতো শ্রমিক ততো প্রবাসী এবং যতো প্রবাসী ততো ফরেন কারেন্সি বা রেমিটেন্স। বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর জন্য এখন আলাদা মন্ত্রণালয় আছে। বিশেষ অধিদপ্তর আছে। বিদেশে রাষ্ট্রদূতদের প্রধান কাজ শ্রমবাজার অনুসন্ধান এবং না থাকলে তৈরি করা। 

নারী-পুরুষ মিলিয়ে গত ১৪ বছরে ৪৫ হাজার শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে প্রবাসে। শুধুমাত্র ২০২৩ সালেই রেকর্ড ৪৫৫২ জন শ্রমিকের মৃতদেহ এসেছে দেশে। তার পরও শ্রমিক পাঠানোর প্রবাহ কমেনি। কারণ এ খাত থেকে প্রতি বছর কম-বেশি ২২ বিলিয়ন ডলার দেশে আসে! বছরে এই ২২ বিলিয়ন ডলারে লোভে মরুক-বাঁচুক শ্রমিক ঠেলে পাঠানোর নাম 'প্রবাসে চাকরির সুযোগ'। গার্মেন্ট সেক্টর নয়, এই প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিটেন্সই দেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের খাত।

এই খাত সচল রাখতেই পরিবার পরিকল্পনা বন্ধ করে জন্মদানে উৎসাহ যোগানো হয়েছে। যতো প্রবাসী শ্রমিক ততো রেমিটেন্স। এই রেমিটেন্স দিয়েই আমাদের 'উন্নত দেশ'-এর সাইনবোর্ড। এসবই আমাদের রাজনীতিক-আমলা ব্যাপারিগণের ফুটানি।

এটা করতে গিয়ে যা হয়েছে, হাইব্রিড উৎপাদন করেও ১৮ কোটি মানুষের খাদ্য চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। জিডিপি বাড়িয়ে দেখানোর জন্য জনসংখ্যা সাড়ে ষোল কোটি দেখিয়েও তাদের ভোগ্য পণ্যের যোগান দেওয়া যাচ্ছে না। বলা হচ্ছে চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ, মাছে তৃতীয়, ছাগলে চতুর্থ ইত্যাদি। বাস্তবতা হচ্ছে চাল-গম-তেল-ডাল-মাছ-ডিম-চিনির মত নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য আমদানি তো করতে হচ্ছেই, তার সঙ্গে সকল প্রকার মশলা, কসমেটিক, পশুখাদ্য, হাঁসমুরগীর খাদ্য, গরু-মোষ, কেমিক্যালস, মেশিনারি, কাপড়, এক্সেসরিজ....সব। অর্থাৎ পানি আর বাতাস বাদে সবই আমদানি করতে হচ্ছে। আর এইসকল আমদানির প্রধান উৎস ভারত ও চীন।

ভারত থেকে প্রায় সকল প্রকার অত্যাবশকীয় পণ্য আমদানির পরও ভারত কোনো কারণে কোনো একটি পণ্য রপ্তানি না করলেই 'ভারত বয়কট'! এই ১৮ কোটি মানুষের প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ কারণে-অকারণে, এমনকি এমনি এমনিও ভারতবিরোধীতা করে।

এই বিরোধীতা যথাযথ হতো যদি বাংলাদেশকে ভারত থেকে কোনো কিছুই না আনতে হতো। আধুনিক বিশ্বে কোনো দেশ বলতে পারবে না তারা সবকিছুতে শতভাগ স্বয়ংসম্পূর্ণ। রাশিয়া-আমেরিকা-ব্রিটেন-জার্মানি-ফ্রান্স-জাপান-চীনের মত দেশকেও কিছু না কিছু আমদানি করতে হয়।

তারা 'সামান্য কিছু' আমদানি করে। আর বাংলাদেশ করে প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ। সর্বশেষ ভারত থেকে আমদানির তালিকায় এসেছে কচুরমুখি এবং নারিকেল! কেন? কোন কারণে এমন বিনা ইনভেস্টমেন্টের পণ্য এখানে ঘাটতি হলো? আর হলেই বা আমদানি করতে হবে কেন?

এরও উত্তর আছে। দেশের প্রকাশ্য স্বীকৃত বিজনেস সিন্ডিকেট এক একটা ভোগ্য পণ্য নিয়ে মানুষকে জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। তখন সরকার জনগণের কাছে 'ভালোমানুষ' সাজতে ওই পণ্য আমদানি করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। গত কয়েক মাসে ডিম নিয়ে এমন ডাকাতির পর সরকার ডিম আমদানি করেছে। তবে কি ধরে নিতে হবে সিন্ডিকেট কচুরমুখি, নারিকেল, পেঁয়াজ-রসুন-আদা, মানকচু, শোলাকচু কিংবা হেলেঞ্চাশাককেও স্টক করে কোটি টাকা হাতাচ্ছিল?

বেশুমার দখল, পরিকল্পনাহীন শহর-জনপদ আর বিদেশের কাছে ইজারা দিতে দিতে চাষের জমি শেষ। জনআবাদি বাড়তে বাড়তে চাষযোগ্য শেষ জমিটুকুও শেষ। চাষীরা উৎপাদন করবে কোথায়? প্লাস্টিকের বোতলে?

মন্তব্য করুন: