আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার ভয়াবহ পরিণতি: ইসলাম কী বলে?
ছবি: সংগৃহীত
আত্মীয়তার সম্পর্ক মানুষের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ বন্ধন। কিন্তু সামান্য মনোমালিন্য, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব কিংবা অহংকারের কারণে অনেকেই আপনজনদের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দেন। কেউ বছরের পর বছর ভাই-বোনের খোঁজ নেন না, আবার কেউ মা-বাবা কিংবা নিকটাত্মীয়দের সঙ্গেও সম্পর্ক ছিন্ন করেন। কিন্তু ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করাকে অত্যন্ত গুরুতর বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এর পরিণতি সম্পর্কেও কোরআন ও হাদিসে কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে।
আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীদের বিষয়ে কোরআনের সতর্কবার্তা
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীদের নিন্দা করেছেন। সূরা মুহাম্মাদের ২২ ও ২৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, তাদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ রয়েছে। ফলে তারা বধির ও দৃষ্টিহীন হয়ে যায়। এই আয়াতের মাধ্যমে আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট করার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে।
জান্নাতে প্রবেশের ক্ষেত্রে কঠোর সতর্কতা
আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। হজরত জুবাইর ইবন মুতইম (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন; “আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৮৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫৬)
হাদিসটির ব্যাখ্যায় আলেমরা বলেছেন, এটি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার গুরুতর অপরাধ সম্পর্কে কঠোর হুঁশিয়ারি। এর অর্থ এই নয় যে, কোনো মুসলিম আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করলেই সব অবস্থায় চিরকাল জান্নাত থেকে বঞ্চিত হবে; বরং এ অপরাধের ভয়াবহতা উপলব্ধি করে তওবা করা ও সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের চেষ্টা করা জরুরি।
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করলে কী লাভ?
আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার অনেক ফজিলত রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন; “যে ব্যক্তি কামনা করে যে তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং তার আয়ু দীর্ঘ হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৮৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫৭) অর্থাৎ আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা রিজিকে বরকত ও দীর্ঘ জীবনের কারণ হওয়ার সুসংবাদ বহন করে।
কেউ কষ্ট দিলে কি সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে?
আত্মীয়রা কষ্ট দিলে কিংবা অন্যায় আচরণ করলেও সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করে দেওয়া সমাধান নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রকৃত আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী সম্পর্কে বলেছেন, সে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায়কারী নয় যে শুধু প্রতিদানের ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখে; বরং আত্মীয়রা সম্পর্ক ছিন্ন করলেও সে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৯১) তবে এর অর্থ এই নয় যে, নির্যাতন বা ক্ষতিকর পরিস্থিতি নীরবে সহ্য করতে হবে। প্রয়োজন হলে নিজের নিরাপত্তার জন্য দূরত্ব বজায় রাখা, যোগাযোগ সীমিত করা এবং বিশ্বস্ত ব্যক্তির সহায়তা নেওয়া যায়। সম্ভব হলে নিরাপদ উপায়ে খোঁজখবর রাখা ও সম্পর্কের ন্যূনতম অধিকারগুলো আদায়ের চেষ্টা করা উচিত।
কীভাবে আত্মীয়তার সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করবেন?
অভিমান ভুলে নিজে থেকে সালাম দিন বা ফোন করুন।
ভুল হয়ে থাকলে ক্ষমা চান এবং অন্যের ভুল ক্ষমা করার চেষ্টা করুন।
অসুস্থতা, বিপদ কিংবা প্রয়োজনে আত্মীয়ের পাশে দাঁড়ান।
সম্পত্তি বা পারিবারিক বিরোধ থাকলে ন্যায়সংগত সমাধানের চেষ্টা করুন।
সরাসরি যোগাযোগ সম্ভব না হলে নিরাপদ উপায়ে খোঁজখবর নিন।
আত্মীয়তার সম্পর্ক শুধু সামাজিক বন্ধন নয়, এটি ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্দেশনা। দুনিয়ার সামান্য বিরোধের কারণে এমন সম্পর্ক নষ্ট করা উচিত নয়, যার রক্ষণাবেক্ষণে রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও বিশেষ প্রতিদানের সুসংবাদ। তাই সময় থাকতে অভিমান দূর করে আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখার চেষ্টা করা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব।
বিভি/এনএইচ













মন্তব্য করুন: