ইসলামি ১২ মাসের নাম ও বৈশিষ্ট্য, কোন মাসের গুরুত্ব কতোটুকু?
ছবি: সংগৃহীত
ইসলামি জীবনব্যবস্থায় হিজরি বর্ষপঞ্জির গুরুত্ব অপরিসীম। রমজানের রোজা, হজ, ঈদুল আজহা, আশুরাসহ মুসলমানদের গুরুত্বপূর্ণ অনেক ইবাদত ও ধর্মীয় দিবস নির্ধারিত হয় চাঁদভিত্তিক এই বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী। হিজরি বছরে রয়েছে ১২টি মাস। প্রতিটি মাসের রয়েছে নিজস্ব পরিচয় ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য। তবে সব মাসের বিশেষত্ব এক নয়; কিছু মাসের মর্যাদা কোরআন ও সহিহ হাদিসে বিশেষভাবে বর্ণিত হয়েছে।
হিজরি ১২ মাসের নাম ও বৈশিষ্ট্য
১. মুহাররম
হিজরি বছরের প্রথম মাস মুহাররম। এটি ইসলামে অত্যন্ত সম্মানিত চারটি নিষিদ্ধ বা পবিত্র মাসের একটি। এ মাসের ১০ তারিখ আশুরা নামে পরিচিত। সহিহ হাদিসে আশুরার রোজার বিশেষ ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ দিনের রোজার মাধ্যমে আগের এক বছরের গুনাহের কাফফারা হওয়ার আশা প্রকাশ করেছেন।
২. সফর
হিজরি বছরের দ্বিতীয় মাস সফর। জাহেলি যুগে এ মাসকে অশুভ মনে করার প্রচলন ছিল। ইসলাম এ ধরনের কুসংস্কার সমর্থন করে না। কোনো মাস নিজে থেকে অমঙ্গল বয়ে আনে, এমন বিশ্বাসের ইসলামে ভিত্তি নেই। এ মাসেও অন্যান্য সময়ের মতো ইবাদত, তওবা ও নেক আমল করা যায়।
৩. রবিউল আউয়াল
হিজরি বছরের তৃতীয় মাস রবিউল আউয়াল। ইসলামের ইতিহাসে এ মাস বিশেষভাবে আলোচিত, কারণ প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, এ মাসের ১২ তারিখে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম হয়েছিল। তবে তাঁর জন্মতারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ মাসে মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ জানা, তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ এবং তাঁর প্রতি দরুদ পাঠের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।
৪. রবিউস সানি
এটি হিজরি বছরের চতুর্থ মাস। রবিউস সানি বা রবিউল আখির নামেও পরিচিত। এ মাসের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ রোজা, নামাজ কিংবা উৎসবকে শরিয়তসম্মত বিশেষ আমল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার নির্ভরযোগ্য দলিল নেই। তাই এ মাসেও নিয়মিত ইবাদত ও সৎকর্মে মনোযোগী হওয়া উচিত।
৫. জমাদিউল উলা
হিজরি বছরের পঞ্চম মাস জমাদিউল উলা। এটি জমাদিউল আউয়াল নামেও পরিচিত। এ মাসের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ ইবাদত বা ফজিলত সহিহ দলিলে প্রমাণিত নয়। তবে মুসলমানের প্রতিটি দিনই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সুযোগ।
৬. জমাদিউস সানি
এটি হিজরি বছরের ষষ্ঠ মাস। জমাদিউল আখির নামেও পরিচিত। এ মাসের জন্য আলাদা কোনো বিশেষ ধর্মীয় বিধান নেই। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও মানুষের হক আদায়ের মতো আমল সারা বছরই গুরুত্বপূর্ণ।
৭. রজব
রজব হিজরি বছরের সপ্তম মাস এবং সম্মানিত চারটি মাসের একটি। কোরআনের সূরা আত-তাওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে চারটি পবিত্র মাসের কথা উল্লেখ রয়েছে। রজব মাসে নেক আমল ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার বিষয়ে সচেতন থাকা উচিত। তবে রজবের নির্দিষ্ট কোনো দিনের বিশেষ নামাজ বা নির্দিষ্ট রোজার বিশেষ ফজিলত দাবি করতে হলে নির্ভরযোগ্য দলিল প্রয়োজন।
৮. শাবান
শাবান হিজরি বছরের অষ্টম মাস। রমজানের আগের মাস হওয়ায় এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে পাওয়া যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজান ছাড়া অন্য কোনো মাসে শাবানের মতো এত বেশি নফল রোজা রাখতেন না। তাই রমজানের প্রস্তুতি, নফল রোজা ও আত্মশুদ্ধির জন্য মাসটি গুরুত্বপূর্ণ।
৯. রমজান
রমজান হিজরি বছরের নবম মাস এবং মুসলমানদের কাছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাস। এ মাসে প্রাপ্তবয়স্ক ও সামর্থ্যবান মুসলমানদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে। পবিত্র কোরআন এ মাসেই নাজিল হয়েছে। এ মাসে রয়েছে লাইলাতুল কদর, যে রাতকে কোরআনে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বলা হয়েছে। রোজা, তারাবিহ, কোরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে মুসলমানরা এ মাসের ফজিলত অর্জনের চেষ্টা করেন।
১০. শাওয়াল
শাওয়াল হিজরি বছরের দশম মাস। এ মাসের প্রথম দিন ঈদুল ফিতর উদ্যাপিত হয়। রমজানের পর শাওয়াল মাসে ছয়টি নফল রোজা রাখার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। সহিহ মুসলিমের হাদিস অনুযায়ী, যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখার পর শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখে, সে যেন সারা বছর রোজা রাখল।
১১. জিলকদ
জিলকদ হিজরি বছরের একাদশ মাস এবং সম্মানিত চারটি মাসের একটি। এ মাসে যুদ্ধবিগ্রহ থেকে বিরত থাকার বিধানসহ পবিত্র মাসগুলোর বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। নবীজি (সা.)-এর জীবনে এ মাসে সংঘটিত হুদাইবিয়ার সন্ধি ও কয়েকটি উমরাহর ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে। হজের প্রস্তুতির সময় হিসেবেও মাসটি গুরুত্বপূর্ণ।
১২. জিলহজ
জিলহজ হিজরি বছরের দ্বাদশ ও শেষ মাস। এ মাসে হজ অনুষ্ঠিত হয় এবং ১০ তারিখে ঈদুল আজহা উদ্যাপিত হয়। জিলহজের প্রথম দশ দিন নেক আমলের জন্য বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। হাদিসে এ দিনগুলোতে নেক আমলের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। এ মাসের ৯ তারিখ আরাফার দিন; যারা হজে অংশ নেননি, তাঁদের জন্য এ দিনের রোজার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। ১০ থেকে ১৩ জিলহজ পর্যন্ত কোরবানির দিনগুলো বিস্তৃত।
চারটি সম্মানিত মাস কোনগুলো?
পবিত্র কোরআনের সূরা আত-তাওবার ৩৬ নম্বর আয়াত অনুযায়ী, বছরে ১২ মাসের মধ্যে চারটি মাস বিশেষভাবে সম্মানিত। সেগুলো হলো—
১. মুহাররম
২. রজব
৩. জিলকদ
৪. জিলহজ
সহিহ বুখারির হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) এ চারটি মাসের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। এসব মাসের মর্যাদা রক্ষা করা এবং অন্যায়-অপরাধ থেকে বিরত থাকার বিষয়ে বিশেষভাবে সচেতন থাকা উচিত।
হিজরি মাসের হিসাব কীভাবে হয়?
হিজরি বর্ষপঞ্জি চাঁদনির্ভর। নতুন চাঁদ দেখার মাধ্যমে মাস শুরু হয়। এ কারণে হিজরি মাস ২৯ বা ৩০ দিনের হয়ে থাকে। ফলে ইংরেজি সৌরবর্ষের তুলনায় হিজরি বছর প্রায় ১০ থেকে ১১ দিন ছোট। এ জন্য রমজান, হজ ও ঈদ প্রতি বছর ইংরেজি ক্যালেন্ডারে কিছুটা আগে আসে।
ইসলামি মাসগুলো থেকে আমাদের শিক্ষা
ইসলামি মাসগুলোর গুরুত্ব শুধু তারিখ জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সময়কে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে কাজে লাগানোই মূল শিক্ষা। রমজানে রোজা, জিলহজে হজ ও কোরবানি, আশুরায় রোজা এবং সম্মানিত মাসগুলোতে অন্যায় থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে মুসলমানরা নিজেদের জীবনকে আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালিত করতে পারেন।
হিজরি বর্ষপঞ্জির ১২টি মাস মুসলমানদের ধর্মীয় জীবন ও ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কোনো মাসের বিশেষ মর্যাদা সম্পর্কে জানতে হলে কোরআন ও নির্ভরযোগ্য হাদিসের ওপর নির্ভর করা জরুরি। পাশাপাশি ভিত্তিহীন কুসংস্কার ও দলিলবিহীন বিশেষ আমল থেকে দূরে থেকে সারা বছর ইবাদত ও সৎকর্মে অবিচল থাকাই একজন মুসলমানের কর্তব্য।
বিভি/এনএইচ













মন্তব্য করুন: