• NEWS PORTAL

  • সোমবার, ০৯ নভেম্বর ২০২৬

ছাত্রশিবির থেকে আ. লীগ, অতঃপর বিএনপি; বিতর্কে মাউশির রংপুরের উপপরিচালক

রংপুর ব্যুরো 

প্রকাশিত: ০০:১৯, ৯ নভেম্বর ২০২৬

আপডেট: ০০:২০, ৯ নভেম্বর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
ছাত্রশিবির থেকে আ. লীগ, অতঃপর বিএনপি; বিতর্কে মাউশির রংপুরের উপপরিচালক

ছাত্রজীবনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা, কর্মজীবনে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির প্রভাবশালী নেতার সুপারিশে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন-এমন নানা অভিযোগ ও রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তনের বিতর্কে আলোচনায় এসেছেন রংপুর সরকারি কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হারুন-অর-রশীদ। সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালক (কলেজ) পদে তার পদায়ন ঘিরে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কারমাইকেল কলেজে অধ্যয়নকালে হারুন-অর-রশীদ ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীকালে ২৬তম বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারে যোগদানের পর তার রাজনৈতিক অবস্থানে পরিবর্তন আসে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলটির ঘনিষ্ঠ পরিচয় ব্যবহার করে তিনি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেন। কর্মজীবনের শুরুতে গোপালগঞ্জের একটি সরকারি কলেজে কর্মরত থাকাকালে বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও ৭ মার্চের কর্মসূচিতে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় সামনের সারিতে তার উপস্থিতি নিয়েও সহকর্মীদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা ছিল।

হারুন-অর-রশীদের বিরুদ্ধে ২৬তম বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকাকেন্দ্রিক একটি প্রশ্নফাঁস চক্রের সঙ্গে তার এক নিকটাত্মীয়ের সম্পৃক্ততা ছিল এবং সেই চক্রের মাধ্যমে প্রশ্ন পেয়ে তিনি বিসিএসে উত্তীর্ণ হন বলে দাবি করা হচ্ছে। এ-সংক্রান্ত অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি, তদন্ত প্রতিবেদন কিংবা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে অভিযোগটির নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

গোপালগঞ্জ থেকে বদলি হয়ে রংপুর সরকারি কলেজে যোগদানের পরও তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ কানিজ উম্মে নাজমা নাসরিনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে তিনি ব্যক্তিগত ও প্রশাসনিক বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করতেন। এ সুযোগে নিয়মিত ক্লাস না নেওয়া, পরীক্ষার হলে দায়িত্ব পালন না করেও সম্মানি গ্রহণ এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত পরীক্ষার ফি আদায়ের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কলেজ কর্তৃপক্ষের নথি, অডিট প্রতিবেদন কিংবা কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন শিক্ষকরা।

এদিকে ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত বিসিএস জেনারেল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচনে রংপুর সাংগঠনিক বিভাগ থেকে নির্বাহী সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন হারুন-অর-রশীদ। তার রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অবস্থান নিয়েও শিক্ষা ক্যাডারের বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার রাজনৈতিক অবস্থান ও যোগাযোগে নতুন মেরুকরণ ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, মাউশির রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালক (কলেজ) পদে পদায়নের ক্ষেত্রে একজন প্রভাবশালী বিএনপি নেতার সুপারিশ ভূমিকা রেখেছে। তবে ওই সুপারিশের বিষয়টি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে জ্যেষ্ঠতা, দক্ষতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও পেশাগত সততাকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক-কর্মকর্তারা। তাদের মতে, একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ থাকলে সেগুলো যাচাই না করে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়া হলে শিক্ষা প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

রংপুর সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান আইয়ুব আলী এ পদায়নে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যে শিক্ষক দম্ভ করে বলতেন বিএনপি জীবনে ক্ষমতায় আসতে পারবে না, আজ তাদেরই আশীর্বাদে সেই শিক্ষককে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর, রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালক পদে পদায়ন করা হয়েছে। সত্যিই সেলুকাস।”

সচেতন শিক্ষক সমাজের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যক্তিগত তদবিরের পরিবর্তে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং স্বচ্ছতাকে পদায়নের প্রধান মানদণ্ড করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মঈনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল জানিয়েছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্মারক পেয়ে তিনি হারুন-অর-রশীদকে পদায়ন করেছেন রংপুর মাউশিতে। এর বেশি কিছু বলতে অনিহা প্রকাশ করেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সদ্য পদায়নপ্রাপ্ত উপপরিচালক হারুন-অর-রশীদের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে নম্বরটি বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

বিভি/টিটি

মন্তব্য করুন: