• NEWS PORTAL

  • শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ডিজেল রফতানি বন্ধে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত জানালেন ট্রাম্প

প্রকাশিত: ১৬:৪১, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
ডিজেল রফতানি বন্ধে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত জানালেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছানোর পর জ্বালানি রফতানি সীমিত করার আলোচনা শুরু হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ডিজেল রফতানি কমানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, রফতানি কমালে অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ বাড়ার পরিবর্তে শোধনাগারগুলোর উৎপাদন কমে যেতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও ডিজেলের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন ডিজেলের গড় দাম দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৫০ ডলার। এক ডলার ১২৩ টাকা হিসাবে প্রতি লিটারে এর দাম পড়ে প্রায় ২১০ টাকা। এক মাস আগে প্রতি গ্যালন ডিজেলের দাম ছিল ৫ দশমিক ৬১ ডলার, যা প্রতি লিটারে প্রায় ১৮১ টাকার সমান। অর্থাৎ এক মাসে দেশটিতে ডিজেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) দৈনিক তথ্যেও এই মূল্যবৃদ্ধির চিত্র উঠে এসেছে।

বিশ্বের অন্যতম বড় ডিজেল রফতানিকারক যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে উৎপাদিত ডিজেলের একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ বাড়াতে রফতানি কমানোর প্রস্তাব সামনে এসেছে।

মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, সম্ভাব্য স্বেচ্ছামূলক রফতানি সীমাবদ্ধতা নিয়ে বড় তেল শোধনাগারগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নীতি ঘোষণা করা হয়নি। হোয়াইট হাউজও জানিয়েছে, প্রশাসন বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জীবনযাত্রার ব্যয় বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। রয়টার্স/ইপসসের আগস্টের জরিপে ৪৭ শতাংশ ভোটার বলেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার ব্যয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ডিজেলের সংকট শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে সীমাবদ্ধ নয়। রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি শোধনাগারে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারেও সরবরাহ কমেছে।

রাশিয়ায় ড্রোন হামলায় কয়েকটি বড় শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে দেশটির কিছু এলাকায় ডিজেল উৎপাদন কমেছে, আবার কোথাও উৎপাদন বন্ধও হয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ডিজেল মজুতও কমে গেছে। দেশটির এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের মজুত কমে ১০৭ দশমিক ৯ মিলিয়ন ব্যারেলে দাঁড়ায়। চার দশকের বেশি সময়ের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন পর্যায়ের মজুত।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রাজনীতিক মনে করছেন, সাময়িকভাবে রফতানি বন্ধ করা হলে দেশের অভ্যন্তরে সরবরাহ বাড়িয়ে দাম কমানো সম্ভব হতে পারে।

আইওয়ার রিপাবলিকান সিনেটর চাক গ্রাসলি ও আলাস্কার রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভান সাময়িক রফতানি বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। টেনেসির কংগ্রেসম্যান টিম বারচেটও ডিজেল রফতানি সীমিত করার বিষয়ে দুটি বিল উত্থাপন করেছেন। এর একটি বিলে ২০২৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত রফতানি নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, রফতানি বন্ধ হলে যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগারগুলো উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে। কারণ, রফতানি বন্ধের পর অভ্যন্তরীণ বাজারে ডিজেলের মজুত দ্রুত বেড়ে গেলে সংরক্ষণ সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হবে। মজুতের জায়গা সংকুচিত হলে শোধনাগারগুলো অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াকরণ কমিয়ে দিতে পারে।

উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষণেও এমন আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ রফতানি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল উৎপাদন দৈনিক সর্বোচ্চ ৭ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল পর্যন্ত কমতে পারে।

এর ফলে বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রকে পেট্রল আমদানিকারক দেশেও পরিণত হতে হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ডিজেল রফতানি কমিয়ে দিলে দেশটির ওপর নির্ভরশীল বাজারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারে। লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করে। ইউরোপের বাজারেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ কমে গেলে এসব দেশের ক্রেতাদের বিকল্প উৎস থেকে ডিজেল সংগ্রহ করতে হবে। এতে সীমিত সরবরাহের জন্য বিভিন্ন দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক বাজারদরেও।

উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ ঘাটতি পূরণের মতো অতিরিক্ত শোধন সক্ষমতা বড় দেশগুলোর মধ্যে চীনের রয়েছে। তবে চীন সেই ঘাটতি পূরণে এগিয়ে আসবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

ডিজেল রফতানি সীমিত করার প্রভাব শুধু সড়ক ও পণ্য পরিবহনে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ কমে গেলে অন্যান্য জ্বালানির দামেও চাপ তৈরি হতে পারে।

এয়ারলাইনস ফর আমেরিকা জানিয়েছে, রফতানি নিষেধাজ্ঞার ফলে উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোর জ্বালানি ব্যয় বাড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব যাত্রীদের ওপরও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে সব ধরনের রফতানি বন্ধ না করে সীমিত বা স্বেচ্ছামূলকভাবে রফতানি কমানোর পথও বিবেচনায় রয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ র‍্যাচেল জিয়েমারের মতে, এমন ব্যবস্থায় কিছু দেশের জন্য ছাড় রাখা হতে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ করে, তাদের ক্ষেত্রে রফতানি সীমাবদ্ধতায় ছাড় দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।

তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি ট্রাম্প প্রশাসন। বিশ্লেষকদের মূল উদ্বেগ, ডিজেলের সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় রফতানি বন্ধের সিদ্ধান্ত উল্টো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর পরিবর্তে উৎপাদন কমে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও ডিজেলের সংকট ও দাম—দুটিই বাড়তে পারে।

সূত্র: আল-জাজিরা

বিভি/টিটি

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত