উত্তাল দিল্লির রাজপথ
রাহুল গান্ধীকে ধরলো পুলিশ, প্রিয়াঙ্কা শুয়ে পড়লেন রাস্তায়; অতঃপর যা ঘটলো
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিক্ষোভ এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো আন্দোলনে নেমে আটক হয়েছেন ভারতের লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভাদ্রাসহ বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র শীর্ষ নেতারা। যন্তর মন্তরে যাওয়ার পথে তাদের বহনকারী বাস আটকে দেয় পুলিশ। পরে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কাকে সড়ক থেকে জোর করে সরিয়ে বাসে তুলে নেওয়া হয়। এ সময় বিক্ষোভকারীদের বহনকারী একটি বাসের চাকা পাংচার করে দেন কংগ্রেস কর্মীরা।
কংগ্রেসের দাবি, ঘটনাস্থলে থাকা অন্য বিক্ষোভকারীদেরও পুলিশ ছাড় দেয়নি। তাদের ধাক্কা দিয়ে বাসে তুলে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পুলিশ যে বাসে বিক্ষোভকারীদের তুলে নেয়, তার একটি বাসের চাকা দলটির কর্মীরা পাংচার করে দেন। পরে রাহুল গান্ধীকে অন্য একটি বাসে তুলে বারাখাম্বা রোডের একটি থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েক ঘণ্টা পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এর আগের দিনও রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে আটক করা হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তরের দিকে যেতে বাধা দেওয়ার পর তারা আকাশবাণী ভবনের সামনে আকস্মিক অবস্থান কর্মসূচি শুরু করলে তাদের আটক করা হয়।
বুধবারও (৭ অক্টোবর) নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল যন্তর মন্তরে কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের আটক করে। পুলিশের দাবি, সেখানে বিক্ষোভের জন্য আগে থেকে অনুমতি নেওয়া হয়নি।
কেন্দ্রীয় দিল্লির একটি রেস্তোরাঁয় কৌশলগত বৈঠক ও মধ্যাহ্নভোজ শেষে বিরোধী সংসদ সদস্যরা যন্তর মন্তরের উদ্দেশে রওনা হন। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের আমন্ত্রণে জনপথের সাগর রত্ন রেস্তোরাঁয় ওই মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়।
‘ভোট চুরি’ ইস্যুতে আন্দোলন আরও জোরদার করা এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করাই ছিল বৈঠকের উদ্দেশ্য।

খাড়গে অভিযোগ করেন, দেশের গণতন্ত্র ধ্বংস করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বিরোধীরা ‘ভোট চুরি’র বিষয়টি জনগণের কাছে নিয়ে যাবে।
মধ্যাহ্নভোজ শেষে রেস্তোরাঁর বাইরে থাকা বাসে ওঠেন বিরোধী সংসদ সদস্যরা। এরপর তারা যন্তর মন্তরের উদ্দেশে রওনা হন। তবে যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার সব পথেই ব্যারিকেড বসিয়েছিল পুলিশ। পথে বিরোধী সংসদ সদস্যদের বহনকারী বাসগুলো আটকে দেওয়া হয়।
প্রথমে রাহুল গান্ধীসহ কয়েকজন নেতাকে বাসে বসিয়ে রাখা হয়। অন্যদের আটক করতে পুলিশ এগিয়ে গেলে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের নেতারা বাস থেকে নেমে আবার সড়কে বসে পড়েন।
রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও সড়কে বসে পুলিশের সরে যাওয়ার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। একপর্যায়ে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী রাস্তায় শুয়ে পড়েন এবং তাকে সরাতে চ্যালেঞ্জ জানান। তিনি বলেন, “এভাবেই কি সংসদ সদস্যদের সঙ্গে আচরণ করা হয়? এটা নজিরবিহীন। আমরা এখান থেকে সরব না।” শেষ পর্যন্ত পুলিশ রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে জোর করে সরিয়ে বাসে তুলে নেয়।
দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, যন্তর মন্তরে কোনো বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের জন্য আগে থেকে অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। এ জন্য প্রস্তাবিত কর্মসূচির অন্তত ১০ দিন আগে নয়াদিল্লি জেলার উপপুলিশ কমিশনারের কাছে আবেদন করতে হয়।
মধ্যাহ্নভোজ শেষে রাহুল গান্ধীও জানিয়েছিলেন, বিরোধী সংসদ সদস্যরা যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ করবেন। তিনি বলেন, “গতকাল যেমন বলেছিলাম, প্রায় ৩০০ জন সংসদ সদস্য প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে বিক্ষোভ করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। তাই আজ আমাদের পরিকল্পনা হলো নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল যন্তর মন্তরে গিয়ে আবারও একসঙ্গে বসা এবং দেশকে জানানো—আমাদের কাছে জ্ঞানেশ কুমার দেশের বৈধ নির্বাচন কমিশনার নন। মোদি, অমিত শাহ, মোহন ভাগবত এবং জ্ঞানেশ কুমার দেশের গণতন্ত্র ধ্বংস করেছেন।”
মঙ্গলবারের অবস্থান কর্মসূচির ঘটনায় নিজের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া এফআইআর নিয়েও মন্তব্য করেন রাহুল গান্ধী। তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে বর্তমানে ৪৫টি এফআইআর রয়েছে এবং তার লক্ষ্য ১০০টি এফআইআর হওয়া।
মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ বাধা দিলে সংসদ সদস্যরা আট ঘণ্টার বেশি সময় অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। পরে রাহুল গান্ধীসহ বেশ কয়েকজনকে জোর করে সরিয়ে আটক করা হয়।
রাহুল গান্ধী ও অন্যদের রাত ১০টার পর প্রায় দুই ঘণ্টা আটকে রাখার পর ছেড়ে দেওয়া হয়। অধিকাংশ বিরোধী সংসদ সদস্যকে আটকে সামনে এগোতে দেওয়া হয়নি। তবে রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভাদ্রাসহ কয়েকজন কংগ্রেস নেতা নির্বাচন কমিশনের কার্যালয় থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে আকাশবাণী ভবনে ঢুকে পড়েন।
তারা নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে দেখা করার দাবি জানান এবং দুপুরের দিকে সেখানে অবস্থান শুরু করেন। রাত ৮টার পর বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য তাদের সেখান থেকে জোর করে সরিয়ে পুলিশ ভ্যান ও বাসে তুলে নেয়।
মঙ্গলবারের ওই ঘটনায় অনুমতি ছাড়া আকাশবাণী ভবনে প্রবেশ এবং সেখানে ছয় ঘণ্টার বেশি সময় অবস্থান কর্মসূচি করার অভিযোগে বুধবার রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর বিরুদ্ধে এফআইআর করা হয়।
এদিকে, রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর বিরুদ্ধে এফআইআর নিয়ে কংগ্রেস নেতারা বলেছেন, তারা এতে ভয় পাচ্ছেন না।
কংগ্রেসের সংগঠনবিষয়ক সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপাল বলেন, “গান্ধীর বিরুদ্ধে দায়ের করা এফআইআর নিয়ে আমাদের কোনো ভয় নেই। সারা দেশে তার বিরুদ্ধে শত শত এফআইআর রয়েছে।”
কংগ্রেস সংসদ সদস্য জ্যোতিমণি বলেন, “আমরা মধ্যাহ্নভোজের জন্য এখানে এসেছি, তবে বিক্ষোভ চলবে। বিরোধীদলীয় নেতাকে একজন অপরাধীর মতো টেনে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় আমরা তীব্র নিন্দা জানাই। কোনো এফআইআর নিয়েই আমরা উদ্বিগ্ন নই।”
সূত্র: এনডিটিভি
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: