অপরাধের পর নয়, অপরাধের আগেই রাষ্ট্রকে পৌঁছাতে হবে
অপ্রতিমের মায়ের কান্না কি রাষ্ট্রের ঘুম ভাঙাবে?
“আমি বাঁচব ক্যামনে? আমার তো একটাই ছেলে। আমি আমার জীবনটা পার করব ক্যামনে?”
এই প্রশ্নের উত্তর কোনো পুলিশি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নেই। কোনো আসামি গ্রেপ্তারের সংখ্যাতেও নেই। নেই অভিযান শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনেও। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে রাষ্ট্রের সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্বে- নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের ১৩ বছরের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২১ ঘণ্টা পর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভির সূত্র ধরে সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
একটি শিশুর নিখোঁজ হওয়া থেকে তার মরদেহ উদ্ধারের মধ্যবর্তী সময়টি শুধু একটি পরিবারের অপেক্ষার সময় নয়; সেটি রাষ্ট্রের সক্ষমতারও পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় প্রশ্ন একটাই- বিপদ ঘটার পর রাষ্ট্র কত দ্রুত নড়ে বসে?
কারণ, অপরাধের জগৎ অপেক্ষা করে না।
একই সময়ে খুলনায় চুরির অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আজমুল হোসেনকে মারধরের পর পাঁচতলা ভবন থেকে পড়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। পরিবারের অভিযোগ, তাকে মারধর করা হয়েছিল; মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও ঘটনার ধারাবাহিকতা তদন্তেই নির্ধারিত হবে। কিন্তু, এই ঘটনা একটি ভয়ংকর বাস্তবতাকে সামনে আনে; আইন আছে, কিন্তু মানুষ যখন নিজেরাই বিচারক, তদন্তকারী ও শাস্তিদাতা হয়ে ওঠে তখন আইনের শাসন কোথায় থাকে?
ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের ঘটনাটিও কম ভয়াবহ নয়। অভিযোগ অনুযায়ী, অস্ত্রের মুখে এক নারীকে ধর্ষণ, লুটপাট এবং ঘটনার ভিডিও ধারণ করে আরও অর্থ দাবি করা হয়েছে। এখানে অপরাধীরা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেছে ভয় দেখানোর অস্ত্র হিসেবে। কিন্তু, একই প্রযুক্তি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে অপরাধের আলামত ও অপরাধী শনাক্ত করার শক্তিশালী হাতিয়ারও হতে পারে।
তাহলে প্রশ্ন হলো- রাষ্ট্র কি প্রযুক্তির যুগে এখনো কাগজের খাতায় আটকে থাকবে?
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে শিশু নিখোঁজের বিষয়ে ১৫ হাজার ৭১৭টি জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জন উদ্ধার বা পরিবারের কাছে ফিরে গেছে; ২ হাজার ৩৮ জন এখনো অনুদ্ঘাটিত। পুলিশ নিজেই জানিয়েছে, অনলাইন জিডি চালুর পর নিখোঁজ-সংক্রান্ত জিডির সংখ্যা বেড়েছে এবং সব নিখোঁজের ঘটনাকে অপহরণ বা অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
কিন্তু, সংখ্যার হিসাবের আড়ালে যে ২ হাজার ৩৮টি পরিবার এখনো অপেক্ষা করছে, রাষ্ট্র কি তাদের অপেক্ষার হিসাব রাখছে?
একটি শিশুর নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ আমাদের ব্যবস্থায় অনেক সময় একটি জিডি হয়ে যায়, নম্বর হয়, কাগজ এগোয়- কিন্তু অনুসন্ধানের গতি নির্ভর করে মানুষের উদ্যোগ, স্থানীয় সক্ষমতা ও কখনো কখনো ব্যক্তিগত তৎপরতার ওপর।
এভাবে একটি আধুনিক রাষ্ট্র তার নাগরিককে খুঁজবে কেন?
নিখোঁজ শিশুর জিডি মানেই ‘আরেকটি জিডি’ নয়। সেটি হতে পারে সম্ভাব্য অপহরণ, পাচার, নির্যাতন কিংবা হত্যার প্রথম সংকেত। তাই জিডিকে কেবল প্রশাসনিক নথি না বানিয়ে ঝুঁকির সংকেত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
দেশের প্রতিটি থানার জিডি যদি একটি নিরাপদ কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে নিখোঁজ শিশুর ছবি, বয়স, পোশাক, শেষ অবস্থান, ব্যবহৃত মোবাইল ফোন এবং সম্ভাব্য গতিপথ- আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় দ্রুত সংশ্লিষ্ট ইউনিটের কাছে পৌঁছাতে পারে। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ দ্রুত সংরক্ষণের নির্দেশনা যেতে পারে। প্রয়োজনে ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ যুক্ত হতে পারেন।
আজকের অপরাধী যদি প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে, রাষ্ট্র কেন পারবে না?
আর যদি পারে, তাহলে করছে না কেন?
এখানেই আমাদের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংস্কারের জায়গা।
আমরা এখনো অনেক সময় অপরাধের পর পুলিশিং করি। ঘটনা ঘটলো, মামলা হলো, আসামি খোঁজা হলো, অভিযান হলো। কিন্তু, আধুনিক পুলিশিংয়ের লক্ষ্য হওয়া উচিত ঝুঁকি শনাক্ত করা, দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেওয়া, আলামত রক্ষা করা এবং অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো।
শুধু মাদকবিরোধী অভিযান দেখিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির প্রমাণ দেওয়া যায় না। মানুষ দেখতে চায়- তার সন্তান নিখোঁজ হলে পুলিশ কত দ্রুত সক্রিয় হয়; তার ওপর হামলা হলে তদন্ত কত দ্রুত শুরু হয়; সিসিটিভি ফুটেজ কত দ্রুত সংগ্রহ হয়; ডিজিটাল আলামত কতটা দক্ষতার সঙ্গে বিশ্লেষণ করা হয়; আর তদন্তে গাফিলতি হলে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা হয়।
রাষ্ট্রের সক্ষমতা গ্রেফতারের সংখ্যায় নয়, নাগরিককে বিপদের মুহূর্তে কত দ্রুত উদ্ধার করতে পারে- সেখানেও মাপতে হবে।
আরেকটি কঠিন সত্য স্বীকার করতে হবে। কোনো কোনো ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা, পক্ষপাতিত্ব কিংবা অপরাধীদের সঙ্গে যোগসাজসের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগ যেমন হালকাভাবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, তেমনি প্রমাণ ছাড়াই সত্য বলেও ধরে নেওয়া যায় না। প্রয়োজন স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্ত। কারণ, পুলিশও আইনের ঊর্ধ্বে নয়, আবার অভিযোগ উঠলেই কোনো পুলিশ সদস্য অপরাধী হয়ে যান না।
এই ভারসাম্যই আইনের শাসন।
সরকার চাইলে আগামী ছয় মাস প্রযুক্তিনির্ভর আইনশৃঙ্খলা ও তদন্ত সংস্কারের পরীক্ষামূলক সময় হিসেবে ঘোষণা করতে পারে। প্রথম ধাপে কয়েকটি জেলা ও মহানগরে চালু হতে পারে—
নিখোঁজ ব্যক্তি ও শিশুর কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেস;
তাৎক্ষণিক সতর্কতা ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা;
সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণের বাধ্যতামূলক প্রটোকল;
ডিজিটাল ফরেনসিক ইউনিট শক্তিশালীকরণ;
মামলা ও তদন্তের প্রতিটি ধাপের ডিজিটাল ট্র্যাকিং;
এবং তদন্তে অযৌক্তিক বিলম্বের জন্য জবাবদিহি।
তবে, প্রযুক্তির নামে নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা যেন ভূলুণ্ঠিত না হয়। মোবাইল লোকেশন, কল রেকর্ড, ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা ডিজিটাল তথ্য ব্যবহারে অবশ্যই আইনগত অনুমোদন, যথাযথ প্রক্রিয়া ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্যই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিচয়।
অপ্রতিমের মৃত্যু তাই শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্তের বিষয় নয়। এটি আমাদের সামনে একটি আয়না ধরে দিয়েছে।
আজ প্রশ্ন- একজন মা তার সন্তানকে হারানোর পর রাষ্ট্রকে ডাকবেন, নাকি রাষ্ট্র এমন ব্যবস্থা তৈরি করবে যাতে সেই সন্তান বিপদে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাষ্ট্রের যন্ত্র সক্রিয় হয়ে যায়?
আজমলের মৃত্যু আমাদের প্রশ্ন করছে- অভিযোগ উঠলেই কি জনতা আদালত বসাবে?
গফরগাঁওয়ের ঘটনা প্রশ্ন করছে- অপরাধীরা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করবে, আর রাষ্ট্র শুধু পুরোনো পদ্ধতিতে তাদের খুঁজবে?
আর হাজার হাজার নিখোঁজ শিশুর তথ্য প্রশ্ন করছে- জিডি কি শুধু একটি নম্বর, নাকি রাষ্ট্রের কাছে সাহায্যের প্রথম সংকেত?
এখন সময় এসেছে উত্তর দেওয়ার।
অপরাধের পরে অভিযান নয়, আগে ঝুঁকি শনাক্ত করতে হবে।
জিডির পরে অপেক্ষা নয়, তাৎক্ষণিক অনুসন্ধান শুরু করতে হবে।
শুধু গ্রেফতার নয়, প্রমাণভিত্তিক তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
শুধু মামলা নয়, তদন্তের প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ, একজন নাগরিক যখন থানায় গিয়ে জিডি করেন, তখন তিনি শুধু একটি কাগজ জমা দেন না, তিনি রাষ্ট্রের কাছে তার নিরাপত্তার দায়িত্বও তুলে দেন।
সেই দায়িত্বের মূল্য একটি জিডি নম্বর হতে পারে না।
অপরাধের পর পুলিশ পৌঁছাবে, এটি দায়িত্ব।
বিপদের শুরুতেই পুলিশ পৌঁছাবে, এটি সক্ষমতা।
অপরাধ ঘটলে সত্য উদ্ঘাটন করবে, এটি আইনের শাসন।
আর নাগরিক যেন রাষ্ট্রকে ডাকতে ডাকতে সন্তান হারিয়ে না ফেলেন- সেই রাষ্ট্রই হবে সত্যিকার অর্থে নিরাপদ রাষ্ট্র।
লেখক: সভাপতি, মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম কাউন্সিল
ই-মেইল : [email protected]
(বাংলাভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, বাংলাভিশন কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার বাংলাভিশন নিবে না)
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: