• NEWS PORTAL

  • শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬

জেন-জি ঝড়ে কাঁপছে ফ্রান্স, বন্ধ চার শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

প্রকাশিত: ১৮:১১, ২ অক্টোবর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
জেন-জি ঝড়ে কাঁপছে ফ্রান্স, বন্ধ চার শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, শিক্ষক সংকট, জরাজীর্ণ অবকাঠামো ও অতিরিক্ত ক্লাসের চাপসহ নানা দাবিতে জেন-জি শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ফ্রান্স। রাজধানী প্যারিসের আশপাশে শুরু হওয়া আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে দেশটির বিভিন্ন শহরে। কোথাও অবরোধ, কোথাও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের চেষ্টার পাশাপাশি পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।

চলমান অস্থিরতার মধ্যে শুক্রবার (২ অক্টোবর) দেশজুড়ে চার শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে জানিয়েছেন, ৪০০-এর বেশি স্কুল ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। যেখানে সরাসরি পাঠদান সম্ভব নয়, সেখানে দূরশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।

গত সপ্তাহের শেষ দিকে প্যারিস অঞ্চলের কয়েকটি হাইস্কুলে বিক্ষোভ শুরু হয়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক কম, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি এবং ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামোর অবস্থা নাজুক। দীর্ঘ ক্লাস সূচি ও পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে তাদের। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রক্রিয়া নিয়েও কিছু শিক্ষার্থী অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।

প্রথমদিকে শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি এলাকায় বিক্ষোভ দ্রুত সহিংস হয়ে ওঠে। নঁত ও রুয়াঁর কয়েকটি স্কুলে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। মার্সেইয়ে একটি স্কুলের সামনে পেট্রল ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় কয়েকজন শিক্ষক আক্রান্ত হন। স্ট্রাসবার্গে একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। তুলুজে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দাঙ্গা পুলিশের সংঘর্ষ হয়। বিভিন্ন শহরে গণপরিবহন চলাচলও সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু আন্তঃমন্ত্রণালয় সংকট বৈঠক করেছেন। একই সঙ্গে বিক্ষোভপ্রবণ এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১ অক্টোবর পর্যন্ত আন্দোলন শুরুর পর প্রায় দুই হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে। তাদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশকে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে। শুধু ১ অক্টোবরই ১ হাজার ৯৪৯ জনকে আটক করা হয়।

সংঘর্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও শিক্ষা খাতের কর্মীরাও আহত হয়েছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ১ অক্টোবরের সংঘর্ষে ৩০৫ জন পুলিশ ও জেন্ডারম সদস্য আহত হন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলন শুরুর পর ১৭০ শিক্ষার্থী এবং শিক্ষা খাতের ৬৫ জন কর্মী আহত হয়েছেন।

আন্দোলন ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হয়েছে। সরকারের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বামপন্থী দল লা ফ্রঁস ইনসুমিজের (এলএফআই) কয়েকজন রাজনীতিকের বিরুদ্ধে আন্দোলন উসকে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে। তবে দলটির আইনপ্রণেতা লুই বোয়ার্ড অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এলএফআই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানালেও পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করেছে।

সাঁ-দেনির মেয়র ও এলএফআই নেতা বালি বাগায়োকোর ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেখা করে তাদের দাবির প্রতি সমর্থন জানান তিনি। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে আগুনের পাশে তাকে উল্লাস করতে দেখা গেছে বলে অভিযোগ ওঠে। তবে ফরাসি সংবাদমাধ্যম টিএফ১-এর ফ্যাক্ট-চেক ও ল্য পারিজিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রচারিত ভিডিওটি খণ্ডিত। পূর্ণ দৃশ্যে তাকে আগুন লাগাতে দেখা যায়নি; বরং তার পক্ষ থেকে আগুন নেভানোর চেষ্টা করার দাবি করা হয়েছে।

তবে বাগায়োকোর কিছু বক্তব্য নিয়ে আলাদা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ২৯ সেপ্টেম্বর একটি অবরুদ্ধ হাইস্কুলের সামনে পুলিশের আচরণ প্রসঙ্গে তিনি ‘সহিংসতা বৈধ হতে পারে’—এমন মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে তিনি বক্তব্যটি প্রত্যাহার করেননি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৩০ সেপ্টেম্বর প্যারিসের পুলিশ প্রিফেক্ট তার বিরুদ্ধে ‘অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা’র অভিযোগে বিচারিক কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করেন। তবে এটি একটি বিচারিক রিপোর্ট; তাকে কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো নিয়ে আলোচনার পথ খোলা রাখার কথা জানিয়েছে সরকার। শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছেন।

শিক্ষাব্যবস্থার সংকট ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন দেশটির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরও বড় চাপ তৈরি করেছে। একদিকে শিক্ষক ও অবকাঠামোসংক্রান্ত দাবিগুলো নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ চলছে, অন্যদিকে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, সংঘর্ষ ও ব্যাপক আটকের ঘটনায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। শুক্রবারও ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে।

বিভি/টিটি

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত