দিল্লিতে নিরাপত্তা জোরদার: ২ হাজারের বেশি আটক, বিপাকে সরকার
ছবি: হিন্দুস্তান টাইমস
ভারতের নির্বাচন কমিশনপ্রধান জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ ঠেকাতে রাজধানী দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। শনিবার (১০ অক্টোবর) বিক্ষোভের প্রস্তুতিকালে দুই হাজারের বেশি মানুষকে আটক করেছে পুলিশ। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে তরুণদের আন্দোলন ‘ককরোচ’ -এর প্রতিষ্ঠাতাও রয়েছেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভ ঠেকাতে দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় হাজারো পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। শহরের কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা হয়। এ ছাড়া কয়েক ডজন মেট্রো স্টেশন ও বাজার বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনপ্রধানের পদত্যাগ দাবি করে এই বিক্ষোভের আয়োজন করে ককরোচ আন্দোলন। সমালোচকদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের ফলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) অসমভাবে সুবিধা পাচ্ছে। আন্দোলনকারীদের পরিকল্পনা ছিল, দিল্লির কেন্দ্রস্থলে জন্তর মন্তরে কয়েক হাজার মানুষ জড়ো হবেন। তবে বিক্ষোভ শুরুর আগেই নিরাপত্তা বাহিনী এলাকাটি ঘিরে ফেলে।

ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে জানান, দিল্লিতে দুই হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, দেশটির বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়েও প্রায় ৪০০ বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়। এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
দিল্লির একটি জনপ্রিয় হস্তশিল্পের বাজার এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিসৌধসহ বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট বিক্ষোভ হয়। এসব কর্মসূচি থেকে নির্বাচন কমিশনপ্রধানের পদত্যাগ দাবি করা হয়। রয়টার্সের এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া করে এবং অনেককে টেনেহিঁচড়ে বাসে তুলে নিয়ে যায়। এ সময় কিছু তরুণকে ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’ স্লোগান দিতেও শোনা যায়। পুলিশের বাধার মধ্যেও নতুন বিক্ষোভকারী সেখানে আসতে থাকেন। যোগেন্দ্র সোলাঙ্কি নামে এক বিক্ষোভকারীকে পুলিশ নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘এটি জনগণের অধিকার লঙ্ঘন। দেশ আর এটি সহ্য করবে না।’
ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে এবং জ্যেষ্ঠ নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। মুম্বাই থেকে তাদের বহনকারী উড়োজাহাজ দিল্লিতে অবতরণের পর পুলিশ তাদের আটক করে। টেলিভিশনের ভিডিওতে দেখা যায়, উড়োজাহাজের ভেতরে পুলিশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলছেন দিপকে। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমি গ্রেপ্তার হতে এসেছি, আমাকে গ্রেপ্তার করুন। আপনাদের ভয় পাই না।’ জবাবে এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘না, এটি গ্রেপ্তার নয়। দয়া করে সহযোগিতা করুন।’
নেতাদের আটকের ঘটনাকে ‘কর্তৃত্ববাদী আটক’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর নিন্দা জানিয়েছে আন্দোলনটি। তাদের মুক্তির দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি। ককরোচ জনতা পার্টির নেতা অজিঙ্কা শিন্ডে সাংবাদিকদের বলেন, ‘জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরা আগামীকাল, পরদিনও রাস্তায় থাকব।’

দিপকের দাদির মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরও নেতাদের অবস্থান ও শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ তথ্য দিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছে সিজেপি। তবে পুলিশ জানিয়েছে, দিপকেকে তার দাদির মৃত্যুর খবর জানানো হয়েছে এবং শেষকৃত্যে যোগ দিতে বাড়ি ফেরার সহায়তাও দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এদিকে টেলিভিশনের ফুটেজে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নসহ কয়েকজন বিরোধী নেতাকে আটক হতে দেখা গেছে। দুটি ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করার সময় তাদের চার সাংবাদিককে অল্প সময়ের জন্য আটক করা হয়েছিল। রয়টার্সের একজন সাংবাদিককেও সাময়িকভাবে আটক করার পর ছেড়ে দেওয়া হয়।
প্রায় দুই কোটি মানুষের শহর দিল্লির প্রধান সড়ক ও প্রবেশপথগুলোতে তল্লাশিচৌকি বসানো হয়। বাসে উঠে বিক্ষোভকারীদের খোঁজ করা হয় এবং যানবাহনে তল্লাশি চালানো হয়। বিভিন্ন সড়কে ব্যারিকেড ও কংক্রিটের ব্লক বসানোয় যান চলাচল ব্যাহত হয়। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপের সরঞ্জামযুক্ত দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের যানও মোতায়েন করা হয়।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ককে কেন্দ্র করে এই বিক্ষোভকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, সাম্প্রতিক কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে। গত সপ্তাহে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোটার তালিকা সংশোধনের বিষয়ে দুই নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংশোধন প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। জ্ঞানেশ কুমার এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বিজেপির দাবি, নির্বাচনে তাদের সাফল্যের পেছনে মোদির জনপ্রিয়তা ও ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ভূমিকা রেখেছে। দলটি বিরোধীদের বিরুদ্ধে ভুল তথ্য ছড়ানোর অভিযোগও তুলেছে। এর আগে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে প্রায় প্রতিদিনই বিক্ষোভের মুখে পড়েছিল মোদি সরকার। ওই বিক্ষোভের জেরে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন দেশটির শিক্ষামন্ত্রী।

২০২৭ সালের শুরুতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে ভোটার তালিকা নিয়ে এই বিতর্ক ও বিক্ষোভ দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী বলেছেন, মোদিবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো পিছু হটবে না।
অন্যদিকে বিজেপির জ্যেষ্ঠ নেতা রবিশঙ্কর প্রসাদ বলেছেন, তার দল বিক্ষোভের বিরোধী নয়। তবে নির্বাচনে পরাজয়ের পর বিরোধীরা রাজপথের আন্দোলনকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার কারণে সাম্প্রতিক রাজ্য নির্বাচনগুলোর ফলাফল প্রভাবিত হয়েছে। তাদের দাবি, বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে পরিচিত ভারতের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোটার তালিকা যাচাইয়ের সময় প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের তথ্য বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষ অন্যত্র চলে গেছেন, ৩ কোটি মানুষের খোঁজ পাওয়া যায়নি এবং প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, খসড়া তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় চিহ্নিত তথ্যের ভিত্তিতে এসব নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে যোগ্য কোনো ভোটারের নাম ভুল করে বাদ পড়লে তিনি পুনরায় ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আবেদন করতে পারবেন।
সূত্র: রয়টার্স
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: