• NEWS PORTAL

  • রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬

ফ্রাঙ্কফুর্ট-বার্লিন-হামবুর্গে তীব্র প্রতিবাদ, ব্যাপক লুটপাট

প্রকাশিত: ১৫:৫৮, ১ নভেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১৬:০৩, ১ নভেম্বর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
ফ্রাঙ্কফুর্ট-বার্লিন-হামবুর্গে তীব্র প্রতিবাদ, ব্যাপক লুটপাট

ছবি: বিবিসি

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষাব্যবস্থায় অর্থসংকট ও সরকারি ব্যয় সংকোচনের প্রতিবাদে জার্মানিতে আয়োজিত বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিয়েছে। শনিবার রাতে ফ্রাঙ্কফুর্ট, বার্লিন ও হামবুর্গসহ বিভিন্ন শহরে ভাঙচুর, দোকানপাটে লুটপাট এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জলকামান ব্যবহার করেছে পুলিশ। এসব ঘটনায় বিভিন্ন শহরে বহু মানুষকে গ্রেফতার ও সাময়িকভাবে আটক করা হয়েছে।

জার্মানির আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ফ্রাঙ্কফুর্ট ছাড়াও কোলন ও হামবুর্গে সহিংসতার ঘটনা ঘটে। দিনের শুরুতে হাজারো মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভে অংশ নিলেও রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীদের একাংশ জরুরি সেবায় নিয়োজিত কর্মীদের লক্ষ্য করে আতশবাজি, পাথর ও বোতল নিক্ষেপ করেন।

‘জেন জি রেগেল্ট’ (Gen Z regelt) নামের একটি প্রচারাভিযান গোষ্ঠী এসব বিক্ষোভের আয়োজন করে। জার্মান ভাষায় নামটির অর্থ ‘জেন জি দায়িত্ব নিচ্ছে’। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না দেওয়া, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয় সংকোচন এবং বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবার বিরোধিতা ছিল বিক্ষোভের প্রধান বিষয়।

ফ্রাঙ্কফুর্টের প্রধান কেনাকাটার সড়কের একটি বড় অংশ বন্ধ করে দেয় পুলিশ। শহরটিতে বহু মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ফ্রাঙ্কফুর্ট, মিউনিখ ও বার্লিনের কর্তৃপক্ষের হিসাবে, বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ১৮ হাজার পর্যন্ত পৌঁছেছিল। তবে আয়োজকেরা তাদের ওয়েবসাইটে এর প্রায় দ্বিগুণ মানুষের উপস্থিতির প্রত্যাশা জানিয়েছিলেন। জার্মান সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার দেশটির বিভিন্ন শহরে হাজারো মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন।

জেন জি রেগেল্টের মুখপাত্র লিনা ফ্রিডরিখ বলেন, তাদের আন্দোলনের লক্ষ্য যুদ্ধ ও জবরদস্তির পরিবর্তে শান্তি ও স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেওয়া।

তিনি বলেন, “আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্বাস্থ্য ও শিক্ষাব্যবস্থার জন্য আরও ভালো সহায়তা নিশ্চিত করা। আমরা বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবার বিরোধী এবং দায়িত্বের বোঝা আরও ন্যায্যভাবে বণ্টনের পক্ষে।”

শনিবার রাতে ফ্রাঙ্কফুর্ট পুলিশ জানায়, শহরের কেন্দ্রস্থলে সহিংস দাঙ্গা চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ পুলিশ ইউনিট মোতায়েন করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকটি দোকানের জানালা ভাঙচুর করা হয়েছে এবং জরুরি সেবায় নিয়োজিত কর্মীদের লক্ষ্য করে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে।

কর্মকর্তারা জানান, একটি অস্ত্রের দোকানের জানালাও ভাঙা হয়েছে। এ ঘটনায় এক সন্দেহভাজনকে গ্রেফতারের পর দুটি অস্ত্র জব্দ করা হয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বিক্ষোভকারীদের একাংশ অন্য দোকানেও ঢুকে পড়ে এবং জুতা ও বিভিন্ন পণ্য লুট করে।

ফ্রাঙ্কফুর্ট যে হেসে রাজ্যের সবচেয়ে বড় শহর, সেই রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোমান পোসেক অভিযোগ করেন, প্রায় ১০০ জন চিহ্নিত বামপন্থী চরমপন্থি শহরটির বিক্ষোভে অনুপ্রবেশ করেছিলেন। বিক্ষোভের শেষ পরিণতিকে তিনি ‘লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য করেন।

পোসেক বলেন, “ফ্রান্সের সেই দৃশ্যগুলো আমাদের সবার মনে আছে- লুটপাট, বাড়িঘরে আগুন, পুলিশের গাড়িতে আগুন এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর হামলা। এ ক্ষেত্রে ফ্রান্সকে কোনোভাবেই আদর্শ হিসেবে তুলে ধরা উচিত নয়।”

পুলিশ জানিয়েছে, রাত পেরিয়ে রবিবারের দিকে ফ্রাঙ্কফুর্টের পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে।

জার্মানির অন্য শহরগুলোতেও দিনের বেলায় শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের পর সহিংসতার ঘটনা ঘটে।

কোলনে প্রধান রেলস্টেশনের কাছে পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ সময় তাঁদের লক্ষ্য করে বোতল ছোড়া হয় এবং একটি সাইকেলও নিক্ষেপ করা হয়।

কোলনের পুলিশপ্রধান জোহানেস হারমান্স বলেন, তরুণেরা নিজেদের ভবিষ্যতের দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করতে এসেছিলেন। কিন্তু উগ্রপন্থিরা সেই কর্মসূচিতে ঢুকে সহিংসতা ছড়িয়েছেন- এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।

বার্লিনে দিনের বড় বিক্ষোভের পর সন্ধ্যায় আয়োজিত তুলনামূলক ছোট একটি কর্মসূচিতে ২৭ জন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হন। এ ঘটনায় সর্বোচ্চ ৫৬ জনকে সাময়িকভাবে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বার্লিন পুলিশ।

হামবুর্গে কালো পোশাক পরা কিছু ব্যক্তি আতশবাজি ফোটান এবং ব্যারিকেডে আগুন ধরিয়ে দেন। দেশটির সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম এনডিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহরটিতে ১২০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

জার্মানিতে বিক্ষোভের দিনই ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশে বড় আকারের প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।

ফ্রান্সে টানা তৃতীয় সপ্তাহান্তে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে ক্ষোভ জানাতে রাস্তায় নামেন তিন লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষ। বিশেষ করে শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা ও পর্যাপ্ত সরকারি সেবার অভাব নিয়ে তারা প্রতিবাদ জানান।

বিক্ষোভ মোকাবিলায় দেশজুড়ে হাজারো পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেন পুলিশ সদস্যরা। তুলুজ, লিওঁ ও মার্সেইয়ে সংঘর্ষের পর ৫০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানান, পেট্রলবোমার আঘাতে একজন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। প্যারিস পুলিশ জানিয়েছে, কয়েক শ দাঙ্গাকারী বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়েছেন।

ইতালিতেও বিক্ষোভ হয়েছে। রোম ও তুরিনে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

পর্তুগালে বাড়িভাড়া-সংক্রান্ত একটি বিলের প্রতিবাদে হাজারো মানুষ মিছিল করেন। তাদের আশঙ্কা, প্রস্তাবিত বিলটি দেশটির আবাসন সংকট আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। গত এক দশকে দেশটিতে বাড়ির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। বিক্ষোভের পর নতুন করে গড়ে ওঠা একটি তাঁবুশিবির সরিয়ে দিতে অভিযান চালায় পুলিশ।

সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, আয়ারল্যান্ড, স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি, গ্রিস, সার্বিয়া ও আলবেনিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তরুণেরা বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন। দেশভেদে তাদের দাবিতে পার্থক্য থাকলেও জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসনের সুযোগ, শিক্ষার মান এবং সরকারি সেবা খাতে ব্যয় কমানোর মতো বিষয়গুলো এসব আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে।

সূত্র: বিবিসি

বিভি/পিএইচ

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত