• NEWS PORTAL

  • বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

নামাজে মোবাইল বেজে উঠলে কী করবেন? ইসলাম কী বলে

প্রকাশিত: ১২:৫৬, ৮ অক্টোবর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
নামাজে মোবাইল বেজে উঠলে কী করবেন? ইসলাম কী বলে

প্রতিকী (এআই)

নামাজ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের ওপর ফরজ। নামাজ শুধু নির্দিষ্ট কিছু কাজ সম্পন্ন করার নাম নয়; বরং এতে একাগ্রতা, বিনয় ও খুশু-খুজু বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র কোরআনে সফল মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই সফল হয়েছে মুমিনরা, যারা নিজেদের নামাজে বিনয়াবনত।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত ১-২)

বর্তমানে প্রায় সবার হাতেই মোবাইল ফোন। ফলে অনেক সময় নামাজে দাঁড়ানোর পর অসাবধানতাবশত ফোন বেজে ওঠে। তখন অনেকের মনে প্রশ্ন আসে, নামাজরত অবস্থায় ফোন বন্ধ বা কল কেটে দিলে কি নামাজ ভেঙে যাবে?

এ বিষয়ে মুফতি আশিকুল ইসলাম রহমতনগরী (মুফতি, মুহাদ্দিস, খতিব ও লেখক) বলেন ইসলামি শরিয়তে নামাজের মধ্যে এমন কিছু কাজ রয়েছে, যা নামাজের পরিপন্থী। হানাফি ফিকহে এর মধ্যে ‘আমলে কাছির’ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আমলে কাছির বলতে এমন অতিরিক্ত কাজ বোঝায়, যা দেখে দূর থেকে একজন পর্যবেক্ষকের মনে হয়, ওই ব্যক্তি নামাজে নেই। এ ধরনের কাজ নামাজ নষ্ট করে দিতে পারে।

নামাজে ফোন বেজে উঠলে কী করবেন?
নামাজ শুরুর আগেই মোবাইল ফোন সাইলেন্ট বা বন্ধ করে রাখা উত্তম। এতে নিজের নামাজে মনোযোগ বজায় থাকে এবং অন্য মুসল্লিদের নামাজেও বিঘ্ন ঘটে না। তবে অসাবধানতাবশত ফোন সাইলেন্ট না করেই নামাজ শুরু হয়ে গেলে এবং নামাজের মধ্যে ফোন বেজে উঠলে, প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প নড়াচড়ার মাধ্যমে ফোনের রিং বন্ধ করা যেতে পারে।

হানাফি ফিকহের ফতোয়া অনুযায়ী, এক হাত দিয়ে খুব অল্প নড়াচড়ায় ফোনের রিং বন্ধ করে দিলে এবং তা আমলে কাছিরের পর্যায়ে না গেলে নামাজ নষ্ট হবে না। তবে ফোন হাতে নিয়ে দীর্ঘ সময় ব্যস্ত থাকা, দুই হাত দিয়ে মোবাইল ব্যবহার করা, স্ক্রিনে তাকিয়ে নাম বা নম্বর পড়া কিংবা এমন কোনো কাজ করা, যা দেখে বাইরে থেকে মনে হয় ওই ব্যক্তি নামাজে নেই। এসব আমলে কাছিরের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে এবং এতে নামাজ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে শুধু কতবার নড়াচড়া করা হয়েছে, সেটিই একমাত্র বিষয় নয়। বরং নড়াচড়াটি এত বেশি কি না যে তা দেখে একজন পর্যবেক্ষকের কাছে নামাজরত ব্যক্তি নামাজে নেই বলে মনে হয়, হানাফি ফিকহে বিষয়টি এভাবেই বিবেচনা করা হয়।

ফোনের রিং বন্ধ করতে গিয়ে নামাজ নষ্ট হবে কখন?
ধরা যাক, নামাজরত অবস্থায় ফোন বেজে উঠল। মুসল্লি এক হাত দিয়ে সামান্য নড়াচড়া করে ফোনের একটি বাটন চাপ দিয়ে রিং বন্ধ করে দিলেন। এ ক্ষেত্রে সাধারণত নামাজ নষ্ট হবে না।

কিন্তু যদি ফোন বের করতে গিয়ে পকেট থেকে বারবার হাত ঢোকানো-বের করা, দুই হাত দিয়ে ফোন ধরা, স্ক্রিন দেখে কলদাতার পরিচয় বা নম্বর পড়া কিংবা ফোন নিয়ে এমনভাবে ব্যস্ত হওয়া হয়, যা নামাজের স্বাভাবিক অবস্থার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাহলে তা আমলে কাছিরের পর্যায়ে যেতে পারে। তাই নামাজের মধ্যে মোবাইল বেজে উঠলে যতটা সম্ভব কম নড়াচড়ায় এবং দ্রুত রিং বন্ধ করা উচিত। অপ্রয়োজনীয়ভাবে ফোনের স্ক্রিন দেখা বা কল রিসিভ করার চেষ্টা করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

নামাজের আগে মোবাইল সাইলেন্ট করা কেন জরুরি?
নামাজ আল্লাহর সঙ্গে বান্দার গভীর ইবাদত ও মুনাজাতের সময়। এ সময় মোবাইলের রিং শুধু নিজের মনোযোগ নষ্ট করে না, আশপাশের মুসল্লিদেরও খুশু-খুজু নষ্ট করতে পারে। বিশেষ করে জামাতে নামাজের সময় হঠাৎ উচ্চ শব্দে ফোন বেজে উঠলে অন্য মুসল্লিদের নামাজেও বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। তাই মসজিদে প্রবেশের আগে কিংবা নামাজ শুরু করার আগে মোবাইল ফোন সাইলেন্ট করে রাখা একজন মুসল্লির দায়িত্বশীলতার পরিচয়।

নামাজে মোবাইল বেজে উঠলে করণীয়
প্রথমত, অপ্রয়োজনীয়ভাবে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।
দ্বিতীয়ত, সম্ভব হলে এক হাত বা সামান্য নড়াচড়ার মাধ্যমে দ্রুত রিং বন্ধ করতে হবে।
তৃতীয়ত, ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে নাম, নম্বর বা অন্য কোনো তথ্য পড়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
চতুর্থত, ফোন রিসিভ করে কথা বলা যাবে না। কারণ এতে নামাজের স্বাভাবিক অবস্থার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ হয়ে যায়।
পঞ্চমত, নামাজ শুরু করার আগেই মোবাইল সাইলেন্ট বা বন্ধ করে রাখা সবচেয়ে নিরাপদ ও উত্তম পদ্ধতি।

সুতরাং, নামাজে মোবাইল বেজে উঠলেই নামাজ ভেঙে যাবে, বিষয়টি এমন নয়। কীভাবে মোবাইল বন্ধ করা হয়েছে এবং সেই কাজটি ‘আমলে কাছির’-এর পর্যায়ে পৌঁছেছে কি না, তার ওপর বিধান নির্ভর করবে। অল্প নড়াচড়ায় দ্রুত রিং বন্ধ করলে নামাজ নষ্ট হবে না; কিন্তু অতিরিক্ত নড়াচড়া করে আমলে কাছির করলে নামাজ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

ফিকহি রেফারেন্স
হানাফি ফিকহের গ্রন্থগুলোতে নামাজের মধ্যে ‘আমলে কাছির’ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। রদ্দুল মুহতার, বাদায়েউস সানায়ে এবং আল-ফাতাওয়াল হিন্দিয়াসহ বিভিন্ন ফিকহি গ্রন্থে এ বিষয়ে মূলনীতি বর্ণিত হয়েছে। মোবাইল ফোনের রিং বন্ধ করার বিষয়ে সমসাময়িক হানাফি ফতোয়াতেও বলা হয়েছে, অল্প নড়াচড়ায় ফোনের রিং বন্ধ করলে নামাজ নষ্ট হয় না; তবে এমন অতিরিক্ত নড়াচড়া করা যাবে না, যা ‘আমলে কাছির’ হিসেবে গণ্য হয়।
তথ্যসূত্র:
•    কোরআন, সুরা আল-মুমিনুন, আয়াত ১-২
•    ইবনে আবিদিন, রদ্দুল মুহতার, ১/৬২৪
•    আল-কাসানি, বাদায়েউস সানায়ে, ১/২১৫, ১/২২৭
•    আল-ফাতাওয়াল হিন্দিয়া, ১/১০৫
•    MuftiOnline, নামাজে মোবাইলের রিং বন্ধ করা সংক্রান্ত হানাফি ফতোয়া
•    Darul Ifta Birmingham, নামাজে মোবাইলের রিং বন্ধ করার বিধান

বিভি/এনএইচ

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত